প্রথম পাতা » Uncategorized » যশোরের মেয়ে শিলা: ক্রীড়াভুবনের নুতন সৌন্দর্য

যশোরের মেয়ে শিলা: ক্রীড়াভুবনের নুতন সৌন্দর্য

যশোরের মেয়ে শিলা: ক্রীড়াভুবনের নুতন সৌন্দর্য

জাহিদ রহমান: ক্রীড়াভুবনের নতুন সৌন্দর্য হয়ে এসেছেন সাঁতারু মাহফুজা আক্তার শিলা। যশোরের এই মেয়েটি এবারের এসএ গেমসে ব্রেস্ট স্ট্রোক সাঁতারে পরপর দুটি স্বর্ণজয় করে গোটা দেশকে অন্যরকম এক মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। এসএ গেমসে শিলার সাফল্য আলোয় ভীষণরকম আলোকিত হয়েছে বাংলাদেশ। গেমসের তৃতীয় দিনে ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে প্রথম স্বর্ণ জয় করেন তিনি। এরপর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জয় করলে শিলার নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে ৯৭ সালে শ্রীলংকার রহিমা মাইউমির গড় রেকর্ড চূর্ণ করেন মাহফুজা শিলা। আর টানা দশ বছর ধরে সাঁতারে পদক প্রাপ্তির যে বন্ধ্যা চলছিল সেটাও তিনি ঘুচিয়ে দেন। সাঁতারে শিলা যে সাফল্য দেখিয়েছেন এর আগে এভাবে তা কেউ করতে পারেননি। এবারের এসএ গেমসে বাংলাদেশের যতটুকু সাফল্য সেখানে অবশ্যই বড় বেশি দীপ্যমান শিলার সাফল্য। যে সাফল্য সাঁতারকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে বললে ভুল হবে না। সাঁতারে আত্মবিশ্বাসটাও ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।

এসএ গেমস থেকে একজোড়া স্বর্ণপদক আনা শিলাকে নিয়ে এখন চারিদিকে হইচই-এর শেষ নেই। এই তরুণী এখন রীতিমতো সেলিব্রেটি হয়ে উঠেছেন। গণমাধ্যমেও যেনো শিলাই এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়। এসএ গেমসের আগে সাঁতারু মাহফুজা আক্তার শিলার নাম সাধারণ্যে সেই অর্থে কেউ জানতো না। অনেকটাই অজ্ঞাত বা অজানা ছিলেন তিনি। তাঁকে নিয়ে তেমন কোনো শোরগোলও ছিল না। তবে তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের বিস্তৃতি ছিল নিরবে-নিভৃতে। অবশ্য শিলা এসএ গেমসে নিরবে অংশ নিলেও পরিস্ফুটিত হয়েছেন সুরভি ছড়িয়ে। সত্যি কথা কি আমাদের জন্যে বিষাদময় এসএ গেমসে ক্রীড়ামোদীরা যতুটুকু আনন্দে অবগাহন করেছেন তার বেশিটুকুর উৎসই মাহফুজা আক্তার শিলা। এসএ গেমসের দ্বিতীয় দিনে দেশের পক্ষে ভারোত্তলনে প্রথম স্বর্ণ লাভ করেন মাবিয়া। মাবিয়ার আনন্দ অশ্রু মিইয়ে যেতে না যেতেই পরের দিন পুলে জ্বলে উঠেন শিলা। সাফল্যের রঙ ছড়িয়ে তিনি কোটি কোটি ক্রীড়ামোদীকে আনন্দে ভাসিয়ে দেন।

শিলার যে সাফল্য যেখানে ছিল স্বপ্ন, দীর্ঘ সংগ্রাম আর একদল মানুষের পরিশ্রম। সেই ছোট্ট বয়সেই এমন একটি ঘটনার স্বপ্ন দেখেছিলেন শিলা। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় তাকে। যশোরের নওয়াপাড়ার এই মেয়েটির জন্ম হয়েছিল একটি সাধারণ পরিবারেই। যে পরিবারে অভাব-অনটন ছিল। পরিবারের অনেক চাহিদাই যেখানে অপূর্ণ থাকতো। কিন্তু সব বাধার দেওয়াল পেরিয়েই বেরিয়ে আসে শিলা। প্রতিভা থাকলে যা হয়। সবার সহযোগিতায় একেক করে বাধার দেওয়াল পেরুন শিলা।

ছোট্টবেলা থেকেই শিলা ছিল উচ্ছ্বল এবং ভীষণ প্রাণবন্ত। খেলাধূলোর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল বরাবরই। তবে ৯৯ সালে সে সবাইকে খানিকটা চমকে দেয়। ছোট্ট শিলা নওয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ ছাত্রী হিসেবে যশোরে আসে শিশু একাডেমি আয়োজিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। কিন্তু এসে দেখে অ্যাথলেটিক্সের ইভেন্ট শেষ হয়ে গেছে। অতঃপর সাঁতারেই অংশ নেয় সে এবং যথারীতি প্রথম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এরপর শিলা গ্রামে ফিরে যায়। স্বল্পসময়ে প্রতিভার সাক্ষর রেখে যাওয়ায় যশোরের ক্রীড়াসংগঠকদের কেউ কেউ বিষয়টি আলোচনায় তুলেন। অবশেষে তাঁকে খুঁজে নিয়ে আসেন সাঁতারের কোচ-সংগঠক আব্দুল মান্নান। যার হাতে এর আগে আরো অনেক মেয়ে সাঁতার শিখে জাতীয় পর্যায়ে আলো ছড়িয়েছেন। শিলাও যেনো ঠিক সেই হাতে পড়েন। আব্দুল মান্নান নিজ বাড়িতে রেখে তাঁকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এসসময় তাকে সরকারি শিশু সদনেও রেখে আসেন। ওখানে থেকেই অনুশীলন চালিয়ে যেতে থাকেন। এর মধ্যে বয়সভিত্তিক সাঁতারে শিলা একরপর এক চমক দেখাতে শুরু করেন।    

তবে ২০০২ সালটা ছিল তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে আসে। ঐ বছরে বাংলাদেশ গেমসে ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে শিলা ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। ডলি আক্তার প্রথম হন। শিলার এই ফলাফল দেখে বিকেএসপি তাঁকে ভর্তি করতে আগ্রহী হয়। ঐ বছরেই বিকেএসপিতে ভর্তি হন তিনি। তাও সরাসরি ক্লাশ এইটে। বিকেএসপির প্রথা অনুযায়ী ক্লাস সেভেনে ভর্তি হওয়ার কথা থাকলেও ইয়ার ড্রপে সায় না দেওয়ায় তাঁকে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি করে নেয় বিকেএসপি। এরপর আর শিলার পেছনে তাকাতে হয়নি। জাতীয় পর্যায়ের লড়াই-এ একেরপর এক সাফল্য পেয়েছেন। শুধু বাকি ছিল এসএ গেমসে স্বর্ণ পাওয়া। অবশেষে নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে শিলা মুগ্ধময় সাফল্য এনে পুরো দেশটাকেই গৌরাবান্বিত করেছেন।

শিলা বলেন, ‘আসলে ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জে অনুষ্ঠিত জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমি নৌবাহিনীর পক্ষে রেকর্ড করি। তখনই আমার মনে হয়েছে এসএ গেমসে আমার পক্ষে ভাল কিছু করা সম্ভব। এরপরতো নানা ধরনের বঞ্চনা বৈষম্যের শিকার হলাম। উপেক্ষাও কপালে জুটল। কিন্তু কোরিয়ান কোচ পার্ক সবকিছুই যেনো নতুন করে শুরু করে দিল। আমিও নতুন উদ্যোমে এবং নেশায় মত্ত হলাম। এরই ফলাফল দু দুটো স্বর্ণ অর্জন। এই অর্জন আমার জীবনের সেরা সাফল্য। দেশের জন্যে এমন সাফল্য আনতে পেরে আমি অবশ্যই গর্বিত। একই সাথে এও বলবো সাঁতারে এর আগে এ ধরনের সাফল্য কেউই দেখাতে পারেনি।

অল্প বয়সে জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন শিলা। সেই সংগ্রামের কথা তিনি অকপটে বলেন। কোনো তথ্যই মনে হয় তিনি আড়াল করতে চান না। আর তাই হেসে বলেন, ‘দেখুন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম একসময় কেবল কিছু টাকা পাব এই আশায়। পরিবারে আর্থিক অনটন থাকায় ভাবতাম প্রতিযোগিতায় ভাল করলে কিছু টাকা পাব যা দিয়ে আমার প্রয়োজনগুলো মিটবে। এ কারণে সব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। ২০০৩ সালে সাঁতারে ভাল ফলাফল করার কারণে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা পেলাম বিকেএসপি থেকে। ঐ টাকা দিয়ে সেবছর আমি গ্রামের বাড়িতে একখন্ড জমি বন্দোবস্ত নিই। সেই জমিটি এখনও আমার কাছে আছে। এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যে আমি সবসময় স্বচেষ্ট থেকেছি। খেলাধূলা আর লেখাপড়ার বাইরে কিছুই ভাবিনি। পড়ালেখা শেষ করে খেলতে গিয়েছি আবার খেলা শেষ হলে পড়তে গিয়েছি।’

এসএ গেমসের সাফল্য সম্পর্কে শিলা বলেন, ‘এসএ গেমসে কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশ চাপে ছিলাম। পুলে নেমেই আল্লাহকে স্মরণ করেছি এই বলে যে, আমি যেনো গোল্ড পেতে পারি। সেই সাফল্য আমি পেয়েছি। এবার অলিম্পিকে অংশ নিয়ে দেশের জন্যে কিছু করতে চাই।’ শিলা বলেন, ‘ অলিম্পিকে কিন্তু পদক প্রাপ্তির কোনো চাপ থাকবে না। অনেকটা মুক্তভাবেই লড়াই-এ অংশ নিতে পারবো। এখন তাই অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার স্বপ্নটাই বড় বেশি বিস্তৃত হয়েছে। অন্যান্য দেশের অ্যাথলেটরা অলিম্পিক-এর জন্যে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমাদের জন্যে সে সুযোগ একেবারেই নেই। তবে যতটুকু সময় আছে সেটাকেই কাজে লাগোতে হবে। সবাই সহযোগিতা করলে আমি এগিয়ে যেতে পারব ইনশাল্লাহ এবং সেখানে ভালোও করব।’ শিলা যে সাফল্য পেয়েছেন সেখানে অনেকেরই ভীষণরকম অবদান রয়েছে। সেই অবদানের কথা মুক্তচিত্তে তিনি স্মরণ করেন। শিলার মতে, এলাকায় অনেকেরই সাহায্য সহযোগিতা অনুপ্রেরণার কথা কখনই ভুলব না। রেজাউল হাসান ও আমিনুর রহমান ভাই আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। আর কোচ মান্নান স্যারের ঋণতো কখনই শোধ করতে পারবো না। এখন যে সাফল্য সেখানে নৌবাহিনীর অনেক সাপোর্ট রয়েছে। এই বাহিনীই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এখনও এই বাহিনীর সমস্ত ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

শিলার সাফল্যের অন্যতম কারিগর কোচ আব্দুল মান্নান। যার হাত ধরেই শিলার প্রাতিযোগিতামূলক লড়াই-এ আগমন। সেই কোচ আব্দুল মান্নান এবার এসএ গেমসে সাঁতার দলের ম্যানেজার ছিলেন। বললেন, মাহফুজা শিলাতো জাতীয় পর্যায়ে অনেক পদক জিতছে। এবার তাই ওকে বলেছিলাম বিদেশের মাটি থেকে পদক তুলে দিতে পারলেই আমাদের স্বপ্ন সফল হবে। মাহফুজা এবার সেটি পেরেছে। শিলা সম্পর্কে মূল্যায়নে তিনি বলেন, এর আগ যশোরের রেশমা পারভীন দীপু, জোবেদা খানম ইতি, রুবিনা জেসমিন পল্লবী ব্রেস্টস্ট্রোকে দুৗতি ছড়ালেও মাহফুজা ব্যতিক্রম। ও বরাবরই ওভার টেলেন্টেড। যখন দেখলাম ওর মধ্যে প্রতিভা লুকিয়ে আছে তখন ওকে খুঁজে বের করে নিয়ে এলাম। ও আমার বাসায় আমার মেয়েদের সাথে থেকেছে। রেফারি বাচ্চু ভাই-এর বাসায় থেকেছে। আবার সরকারি শিশু সদনেও থেকেছে। আজ শিলার সাফল্য আমাদের সব প্রত্যাশা পূরণ করেছে।

এসএ গেমস থেকে ফিরে এসেই শিলার ব্যস্ত সময় কাটছে। বেশিরভাগ সময়ই মিডিয়ার সাথে কথা বলতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নিজ জেলা যশোর পর্যন্ত যাওয়া হয়নি তাঁর। যশোরে মা বাবাসহ ক্রীড়ানুরাগীরা তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে। যশোর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁর বিশাল গণসংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগও গ্রহণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগও করা হয়েছে। উৎফুল্ল প্রাণবন্ত এই সাঁতারু কদিন পরেই যশোর যাবেন। যশোরবাসী তাঁর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সাকিব, মাশরাফির সাথে বৃহত্তর এই যশোরের মেয়েটিও যে এখন অন্যরকম এক মুগ্ধময় নাম।    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com