প্রথম পাতা » Featured » “একাত্তরের সেই দিনগুলির কথা এখনো জ্বলজ্বল করে”

“একাত্তরের সেই দিনগুলির কথা এখনো জ্বলজ্বল করে”

“একাত্তরের সেই দিনগুলির কথা এখনো জ্বলজ্বল করে”

আবু বাসার আখন্দ, প্রতিদিন ডেস্ক : একাত্তরের সেই দিনগুলির কথা এখনো জ্বলজ্বল করে। সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ায় এবং কঙ্গোর যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতার কারণেই মুক্তিযুদ্ধের শ্রীপুর বাহিনীর অধিনায়ক আকবর হোসেন মিঞা আমাকে সহজেই তার বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করে নেন। দায়িত্ব দেন একজন কমাণ্ডার হিসেবে। তারপর বিজয়ের আগ পর্যন্ত মাগুরার বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত পাকবাহিনী এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো যুদ্ধে অংশ নিই। তবে আমাদের যুদ্ধ কৌশল ছিল ‘হিট এণ্ড রান’ পদ্ধতি। নিজেদের শক্তি সামর্থ বিবেচনায় এই পদ্ধতির মাধ্যমেই আমরা যুদ্ধকালিন পুরো সময়টিতেই পাকসেনাদের তটস্থ করে রাখতাম। এতে ঝুকি ছিল বেশি। পাকিস্তানি সেনাদের শক্তপোক্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কখনো একসঙ্গে বেশি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আক্রমন করা সম্ভব ছিল না। তারপরও প্রাণের ঝুকি নিয়েই কখনো বার জন, কখনো ষোল জন মুক্তিযোদ্ধা দুই-তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে সেনা ক্যাম্পের তিনদিন থেকে আক্রমন করতাম। এতেই তারা তটস্থ হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এই রকম ঘটনা ছিল মাগুরার নোমানি ময়দান, শ্রীপুর থানা ভবন, কাজলি বাজার, হাটগোপালপুর, গাংনালিয়া বাজার, নাকোলের ওয়াপদা এবং বিনোদপুর সহ আরো বেশ কয়েকটি যুদ্ধে। যেসব ক্ষেত্রে আমাদের কাংক্সিখত বিজয় এসেছে।

যুদ্ধজয়ের এসব কাহিনীর বর্ণনা দিচ্ছিলেন মাগুরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমাণ্ডার এবং একাত্তরের শ্রীপুর বাহিনীর ‘কোম্পানি কমাণ্ডার’ সার্জেন্ট বদরুল আলম।

একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সারাদেশ যখন উত্তাল হয়ে উঠছে এ সময় চট্টগ্রামের লালখান বাজারে এম্বাকেশন হেড কোয়ার্টারে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চ রাত ৮টা। সেখানকার রিক্রিয়েশন রুমে অন্যান্য সৈনিকদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানি দুই সৈনিক নায়েক ক্লার্ক মনজুর এবং কেডি খান। এমন সময় তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। নিজের অস্ত্র দিয়ে সেদিন পাকিস্তানি ওই দুই সৈনিককে গুলি করে বেরিয়ে আসেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর স্থানীয়রা তাদের সাদরে বুকে তুলে নেয়। পরদিন চট্টগ্রামের নেভিতে কর্মরত ঝিনাইদহের শহিদুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে ৯দিন ধরে হাটতে হাটতে ফিরে আসেন মাগুরায়। বেশ কিছুদিন পালিয়ে বেড়ানোর পর এপ্রিলের প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বলেন, চট্টগ্রামে পাকিস্তানি দুই সৈনিককে গুলি করে গ্রামের বাড়ি মাগুরা শহরের বেলনগরে ফিরে স্ত্রী বেগম মর্জিনা এবং তিন ছেলেকে নিয়ে সোনাতুন্দি গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠি। সে সময় আমাদের সঙ্গে মাগুরার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক এডভোকেট আসাদুজ্জামানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমও ছিলেন।

শ্বশুরবাড়িতে থাকা অবস্থায় খবর পাই শ্রীপুরের শ্রীকোল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকবর হোসেন মিঞা মুক্তিযুদ্ধের জন্য স্থানীয় গ্রামবাসিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। একদিন সকালে পরিবারের সকলকে বিদায় জানিয়ে আমিও যোগ দিই ওই বাহিনীতে। আঞ্চলিক বাহিনী প্রধান আকবর হোসেন মিঞার নেতৃত্বে পাকসেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে আমাদের বাহিনীর বেশ কয়েকটি সাফল্য রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নোমানি ময়দানের আনসার ক্যাম্পে অবস্থানরত পাকসেনা ক্যাম্পে আক্রমন এবং গাংনালিয়া বাজারে শসস্ত্র রাজাকার বাহিনীর উপর হামলা ও পরাস্থ করার ঘটনা। এ ছাড়াও আরো কয়েকটি সফল অভিযান রয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে অভিযান সফল করে আমরা ফিরে আসতে সক্ষম হই। তবে এসব অভিযান সফলের পিছনে প্রধান শক্তি ছিল শৈলকুপা ও শ্রীপুর থানা লুট থেকে আমাদের পাওয়া প্রায় ৫০টি অস্ত্র।

মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে মাগুরা শহরের নোমানি ময়দানে আনসার ক্যাম্পটি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম কমিটির অফিস এবং কন্ট্রোল রুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু ২৩শে এপ্রিলের পর এটি পাক সেনাদের দখলে চলে যায়। এতে মাগুরার স্বাধীনতাকামী মানুষের আস্থা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে। যে কারণে সেখানে অবস্থানরত পাক সেনাদের তটস্থ করে তুলতে তাদের উপর হামলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যে কারণে খুব সম্ভব অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি একদিন রাত ৩টার দিকে ১৫ থেকে ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আমরা সেখানে হামলা চালাই। এই হামলার জন্য আমরা গাংনালিয়া এলাকা থেকে নৌকায় করে কুমার নদ হয়ে আনসার ক্যাম্পের পূর্বে খেয়াঘাটে পৌছাই। সেখানে পাহারারত দুই রাজাকারকে গুলি করে হত্যার পর আমরা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এই সেনাক্যাম্পে আক্রমন করি। অতর্কিতে হামলার কারণে পাকসেনারা দিক্বিদিক পালানোর চেষ্টা করে। এই হামলার খবরটি জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করে তোলে। এ ঘটনার পর পাক সেনারা আমাদের বাহিনীকে পরাস্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অক্টোবরের শেষ কি নভেম্বরের প্রথম এমন সময়ে ৫০ থেকে ৬০ জন পাকসেনা ও শসস্ত্র রাজাকার শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়া এলাকায় আমাদের উপর হামলা করতে এগিয়ে আসছে এমন পেয়ে আমরা আগেই তাদের প্রতিহত করি। দুপুরের পর তারা আঠারখাদা গ্রামের ভিতর দিয়ে শ্রীপুর রোড ধরে গাংনালিয়া বাজারের আগে ইটভাটার কাছে পৌছলে তাদের লক্ষ্য করে আমরা মুহুর্মূহু গুলি করলে ৫ থেকে ৭ জন মারা যায়। অন্যরা পালিয়ে যেতে পারে। তবে নিহতদের মধ্যে কোন পাক সেনা ছিল না।

অনেকদিন পর একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের রোমহর্ষক স্মৃতি, প্রবল উত্তেজনাকর দিনগুলির আদ্যপান্ত বলতে গিয়ে সত্তরোর্ধ মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলমের শরীরের বিভিন্ন কেপে ওঠে। ঝিলিক দিয়ে ওঠে চোখদুটি।

বদরুল আলম বলেন, গর্বের সাথেই বলতে ভাল লাগে যে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং আকবর হোসেন মিঞার নেতৃত্বে যুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনী আমাদের বাহিনীকে পরাস্ত করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। বাহিনীর অধিনায়ক আকবর হোসেন মিয়াকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেও কোন ফল হয়নি। বরং তত্কালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ৮/৯ নং সেক্টর কমান্ডার আমাদের এই বিশাল বাহিনীর বীরোচিত তত্পরতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক বাহিনী হিসেবে “শ্রীপুর বাহিনী” নাম অনুমোদন দিয়ে সনদ প্রেরণ ছাড়াও বাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে আকবর হোসেন মিঞাকেও লিখিত স্বীকৃতি দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বাহিনীর বিরোচিত ভূমিকার পরও নিসংকোচে ভারতিয় মিত্র বাহিনীর সহায়তার কথা স্বীকার করতেই হয়। যৌথবাহিনীর উপর্যূপরি একের পর এক হামলায় ৭ই ডিসেম্বর আমাদের শ্রীপুর বাহিনী প্রথম শত্রুমুক্ত মাগুরায় প্রবেশ করে সার্বিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com