প্রথম পাতা » Featured » হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ৭৫ বছর

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ৭৫ বছর

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ৭৫ বছর

আবু বাসার আখন্দ : সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। মাগুরার গণ মানুষের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যাপিঠ। যার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর নামটি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট্ট একটি মহকুমা শহর মাগুরা। ছোট্ট সেই শহরের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য এতদূর ছুটে এসেছিলেন গণতন্ত্রের মানসপূত্র হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এ বছর ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন করছে।

ইংরেজি ১৯৩৯ সাল। বৃহত্তর যশোর জেলার নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাড়া সে সময় এ অঞ্চলে উচ্চ শিক্ষার আর কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমন একটি সময়ে মাগুরার কিছু বিদ্যোৎসাহি ব্যক্তি উপলব্ধি করেন একটি কলেজের প্রয়োজনীয়তা। সেই শুভ চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৩৯ সালের ২৮ মার্চ তারিখে। মাগুরা আবদুল গণি হাই মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভায় প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। এরপর ১৯৪০ সালের ২৯ মে মাগুরার তৎকালিন মহকুমা প্রশাসক বাবু এম.সি. দত্তের সভাপতিত্বে কলেজ প্রতিষ্ঠার চুড়ান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। যে সভায় মাগুরার বিশিষ্ট আইনজীবী রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক জনাব মৌলভি সিরাজুল ইসলাম সহ এ মহকুমার আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

১৯৪০ সালে কলেজটি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সে সময় বর্তমান শহীদ মিনারের উত্তর পাশে এজি হাই মাদ্রাসার একটি টিনশেড ঘরে কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছরই ৪১ সালে কলেজটি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের  স্বীকৃতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পেরিয়ে ১৯৪৬ সালের ১৫ই ফেব্রæয়ারি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মাগুরাতে আসেন কলেজটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে। এ সময় সাথে ছিলেন দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। যিনি আরপি সাহা নামে পরিচিত। পরবর্তিতে তিনিই, উন্নয়নের স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে কলেজটির নামকরণের প্রস্তাব রাখেন।

এদিকে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের পর দানবীর আরপি সাহার কাছ থেকে নগদ ৫ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার টাকার সমমূল্যের পাথুরে কয়লা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এছাড়াও উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নিতে মাগুরার বেশকিছু বিদ্যোৎসাহি ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। যাদের মধ্যে কেউ কেউ সেই সময় কলকাতা ও মাগুরায় ব্যবসা ও চাকরিরত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক বাবু প্রফুল চন্দ্র ঘোষ, মাগুরার মুন্সেফ আবদুল হান্নান চৌধুরি, এড. সত্যেন বিশ্বাস, পঞ্চানন সাহা ও জিতেন্দ্র নাথ সাহা।

এখানে উল্লেখ্য যে, ৪৬ সালে কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হলেও আক্ষরিক অর্থে সোহরাওয়ার্দীর নামটি কলেজের সঙ্গে যুক্ত করা হয় আরো অনেক পরে ১৯৫২ সনে।

১৯৪৭ সাল। দেশ বিভাগের সময় কলেজের উন্নয়ন কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়ে। সে সময়ে মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব রকিব চৌধুরী। কলেজের জন্য তিনি অদ্ভুত একটি কাজ করে বসেন। কলেজ উন্নয়ন কাজের স্বার্থে তিনি রেশন কার্ডে চার আনার লেভি ধার্য করেন। যে আয় থেকে কলেজ নিয়মিত অর্থ পেত।

বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগৃহিত অর্থে কলেজের মূল ভবনটির নির্মাণ কাজ চলতে থাকে ক্যাম্পাসের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রধান সড়কের সামনে। বর্তমানে কলেজে আরো অনেক সুন্দর ভবন তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই ভবনটি আজ আর নেই। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। যেটির সঙ্গে স্থানীয় অনেক মানুষের শ্রম, ঘাম; আবেগ, ভালবাসা, জড়িয়ে রয়েছে আজও।

কলেজটির প্রথম পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের নামগুলো বিশেষ ভাবে স্মরণ করতে হয়। তখন পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তৎকালিন এসডিও জনাব আবদুর রকিব চৌধুরী।

৭ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদে সদস্য হিসেবে ছিলেন শ্রী নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তি, আইনজীবী প্রমথভূষণ মিত্র, লোকাল হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্রী বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য, র‌্যালি ব্রাদার্সের জনৈক ম্যানেজার, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মৌলভি সিরাজুল ইসলাম এবং জনাব মৌলবি হাবিবুর রহমান। ওই কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ মাওলানা মোখলেছুর রহমান।

১৯৫২ সালে ‘ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’ নামটি ছেড়ে সাধারণ কলেজে রূপান্তরিত হয়। আক্ষরিক অর্থে তখনই কলেজের নামকরণ করা হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দীর নামটি বাদ দিয়ে ‘মাগুরা কলেজ’ নামে চলতে থাকে। পরবর্তিতে ১৯৭০ সালে আবার বর্তমান নামে ফিরে আসে।

কলেজটিতে ১৯৫৬ সনে প্রথম বিএ শ্রেণী চালু করা হয়। ১৯৬২ সনে চালু হয় আইএসসি ও আইকম। এ সময়েই কলেজের প্রথম বিজ্ঞান ভবনটি নির্মিত হয়। এরপর ৬৪ সনে খোলা হয় বিকম। স্বাধীনতার অব্যবহতি পূর্বে ১৯৭০ সালে বিএসসি খোলা হলে কলেজটি পায় পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজের মর্যাদা।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৯ সনে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। এর দীর্ঘ ১৭ বছর পর ১৯৯৬ সনে ৫টি বিষয় নিয়ে এখানে অনার্স কার্যক্রম শুরু হয়। কলেজটিকে অনার্সে উন্নীতকরণের ক্ষেত্রে তৎকালিন সংসদ সদস্য প্রফেসর ডাক্তার সিরাজুল আকবর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তৎকালিন শিক্ষামন্ত্রী এ.এস.এইচ.কে. সাদেক’কে মাগুরায় এনে অনার্স কোর্স চালুর প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন তিনি। যার ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সনে আরও ৯টি বিষয়ে অনার্স চালু হয়। বর্তমানে এখানে মোট ১৪ বিষয়ে অনার্স এবং ২০১৪ সন থেকে ৯টি বিষয়ে মাস্টার্স পড়ানো হচ্ছে। মাস্টার্স কোর্স চালুর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সুযোগ্য চেয়ারম্যান প্রফেসর ডাক্তার সিরাজুল আকবর এমপি। বর্তমানে কলেজটিতে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থি অধ্যায়ন করছে।

কিন্তু কলেজটিকে, আজকেরই এই অবস্থানে আসার পেছনে বিশেষ করে, সরকারিকরণের আগ পর্যন্ত যাদের রয়েছে অনেক অবদান তাদের মধ্যে আরো কয়েকজনের বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা হলেন শহরের ভায়না গ্রামের মুন্সী পাড়ার মৌলভি আবদুল ওয়াদুদ, এডভোকেট হাবিবুর রহমান, সাবেক ডেপুটি স্পিকার এড. মশিহুল আজম খান, জয়েন উদ্দিন মোক্তার, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাওলানা গোলাম মওলা, সৈয়দ আবদুল গণি, মৌলভি কাজি গোলাম রহমান, সৈয়দ আয়নুল আকতার, সাবেক মন্ত্রী এড. সোহরাব হোসেন, সাবেক এমএনএ সৈয়দ আতর আলি সহ রয়েছেন আরো অনেকে।
মাগুরার শিক্ষা বিস্তারে নাম উল্লিখিত ও অনুল্লিখিত সেইসব মহৎ ব্যক্তিদের অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে ৪ মার্চ কলেজটির ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com