প্রথম পাতা » Featured » মাগুরার চাদঁপুর গ্রামের সুবিধা-বঞ্চিত বাগদিদের খবর কেউ রাখে না

মাগুরার চাদঁপুর গ্রামের সুবিধা-বঞ্চিত বাগদিদের খবর কেউ রাখে না

মাগুরার চাদঁপুর গ্রামের সুবিধা-বঞ্চিত বাগদিদের খবর কেউ রাখে না

হোসেন সিরাজ: স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৫ বছরে মাগুরা জেলার চারটি উপজেলায় শিক্ষাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হলেও এসব উন্নয়ন আয়োজনের কোনটিই স্পর্শ করেনি মাগুরা সদর উপজেলার চাদঁপুর গ্রামে বসবাসরত আদিবাসি ‘বাগদি’ সম্প্রদায়ভুক্ত শতাধিক ভূমিহীন পরিবারগুলোতে। সঙ্গত: কারণে সমাজের মূল ধারার জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নও ঘটেনি আশানুরূপভাবে।

মাগুরা সদর উপজেলা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরবর্তী বেরইল-পলিতা ইউনিয়নের চাদঁপুর গ্রামে ব্রিটিশ শাসনামল থেকে স্থায়ীভাবে বাস করছেন অবহেলিত ওই বাগদি সম্প্রদায়ের লোকেরা। লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে চারশ’ জন। এর মধ্যে প্রায় দুইশ’ জন ভোটার রয়েছেন।

এ প্রতিনিধি সম্প্রতি ঐ গ্রামে গেলে বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর মুখেই শোনা যায় তাদের বঞ্চনার কথা। গৃহবধূ বিশাখা সরকার উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘ভোট আলি বাগ্দিগের কদর বাড়ে। তারপর আমাগের খোঁজ আর কেউই নেয় না’।

জানা যায়, সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচীর আওতায় মাগুরা জেলাকে শতভাগ স্যানিটেশনের আওতায় আনতে গ্রামের মূল ধারার অধিবাসিদের মাঝে রিং-স্বাব বিতরণ করা হলেও বাগ্দিদের অধিকাংশ লোকই বনে জঙ্গলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হন এখনও।

এছাড়া, বাগদি পরিবারের প্রায় সাড়ে চারশ’ জন লোকের খাবার পানি সংগ্রহের জন্য রয়েছে মাত্র চারটি টিউবওয়েল।

Bagdi-Pic-1চাদঁপুর গ্রামের বাগ্দিদের চাষের জমি নেই। অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরা টিনের একচালা ঘর কিংবা কুঁড়েঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। নিজস্ব চাষের জমি না থাকায় বাগদি পুরুষরা অন্যের জমিতে দিন মজুরের কাজ করেন। নারীদের অধিকাংশই পুরুষদের সঙ্গে কাজ করেন। কেউ কেউ মাছ ধরাসহ পাশের বিল থেকে শামুক কুড়িয়ে বিক্রি করেন। কেউবা আবার স্থানীয় বেরইল বাজারে নারিকেলের খোঁসা ছাড়ানোর মজুরি দিয়ে কোনো রকম সংসার চালান।

বাগদি পাড়ায় মেঠো রাস্তার পাশেই ছোট্ট খুপরি ঘরে দুপুরের খাবার রান্না করছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আন্না রাণী। কি রাঁধছেন জানতে চাইলে বললেন, ভাত আর বুনো কচুর পাতা। আলাপকালে জানা গেল, তার  স্বামী সূধান সরকার বিলে গেছেন বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে। পাঁচ মেয়ে তিন ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগে। দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে কয়েকটি খুপরি ঘর তুলে পৃথক অন্নে বসবাস তাদের।

বাগদি পরিবারের শিশুদের জন্যে আলাদা কোন স্কুল নেই। কেউ কেউ স্থানীয় প্রাথমেক বিদ্যালয়ে পড়তে চাইলেও সেখানে তারা অবহেলার শিকার হয়। বাগ্দি শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে নানা ধরণের শর্তারোপ করা হয় বলে অভিযোগ তাদের।

আলাপকালে দুলাল সরকার জানালেন, খ্রিষ্টান মিশনের উদ্যোগে প্রায় ৮ বছর আগে তার বাড়ির পাশে একটি শিশু বিদ্যালয় চালু হয়। ওই বিদ্যালয়ের সুমন নামের একমাত্র শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় একবছর।

শিক্ষা সচেতনতা না থাকায় হরহামেশাই এদের পরিবারে বাল্যবিয়ে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যা নামলে অন্ধকারে ডুবে যায় বাগ্দিপাড়া। এদর বিনোদনের জন্য কোন ব্যবস্থাই নেই।

বাগদি সম্প্রদায়ের মাতব্বর বাটুল মন্ডল অভিযোগ করলেন, আদিবাসিদের জন্য সরকার প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা বাজেট করলেও তাদের উন্নয়ন হয়না। তিনি অভিযোগ করেন, মাগুরায় আদিবাসিদের কমিটি রয়েছে। তিনিও ‘মেছো বাগদি’ সম্প্রদায়ের মাতব্বর হিসাবে ওই কমিটির সদস্য। কিন্তু বাজেটের টাকা জেলার নেতারা মেছো বাগদিদেরকে না দিয়ে পুরোটা তাদের বুনো-বাগদিদের উন্নয়নে ব্যয় করেন। বাগ্দিদের অনেকেই দু:খ করে বললেন যে, এনজিও কিংবা কোন সংস্থা তাদেরকে ঋণও দিতে চায় না।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য কাজী হোসেন আলিও  স্বীকার করলেন যে, আদীবাসী বাগদী সম্প্রদায়ের মানুষগুলো মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি নানা সুয়োগ সুবিধা বঞ্চিত। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে তারা চরম অবহেলার শিকার।

তবে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদেরকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হয় বলে দাবি করলেন তিনি। বাগ্দি সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর সমস্যার ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা সমাজ সেবা বিভাগের উপ-পরিচালক শেখ মাহেনুল হক বললেন, ”এ ধরণের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তাদেরকে আর্থিকভাবে স্ববলম্বী করা জরুরী। এই শ্রেণীর জনগোষ্ঠিকে স্বাবলম্বী করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং মাগুরার বাগ্দি সম্প্রদায়ের লোকেরাও এর সুফল ভোগ করছে”।

ষাটোর্ধ্ব বাটুল মাতব্বরের সাথে আলাপ করে জানা যায়, শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে ‘নীল’ এর (বস্ত্র শিল্পের কাঁচামাল) চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এদেশে নীল চাষ বৃদ্ধির জন্যে ইংরেজরা তখন ভারতের বর্ধমান জেলা থেকে হাজার হাজার শ্রমিক এদেশে নিয়ে আসে। গড়ে তোলে অসংখ্য ‘নীলকুঠি’। এ গ্রামের বাগদিরা ওই নীল শ্রমিকদের বংশধর বলে জানালেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ১৮৬১ সালে নীল বিদ্রোহের পর ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর পতন হলে নীল শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। এসময় তারা মাছ ধরাসহ অন্যান্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এজন্য তাদেরকে ‘মেছো বাগদি’ও বলা হয়।

নৃৃ-বিজ্ঞানীদের মতে, বাগদিরা ‘অস্টিক’ বংশোদ্ভুত। মাগুরার নাকোল সম্মিলনি ডিগ্রী কলেজের সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক খান মাজহারুল হক লিপুর মতে, বাগদিরা ‘রাঁও’ শ্রেণীভুক্ত হওয়ার কারণেই বাঙ্গালী ঘরানার সঙ্গে এদের পার্থক্য সুস্পষ্ট। তবে তার মতে, সময়ের ব্যবধানে এরা অন্যান্য বাঙ্গালীদের মতো জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com