প্রথম পাতা » মুক্তিযুদ্ধ » শহীদ শরীফুল: পঁয়তাল্লিশ বছরেও যে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি

শহীদ শরীফুল: পঁয়তাল্লিশ বছরেও যে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি

শহীদ শরীফুল: পঁয়তাল্লিশ বছরেও যে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি

জাহিদ রহমান: শহীদ শরীফুল। পুরো নাম মো. শরীফুল ইসলাম। বাড়ির সবাই আর গ্রামবাসী যাঁকে আদর করে ‘ফুল’ বলে ডাকতেন।আর্টিলারী কোরের সৈনিক ছিলেন তিন।  একাত্তরের ৪ এপ্রিল যশোর শহরে পাক সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শরীফুল শহীদ হলেও আজও তাঁর স্বীকৃতি মেলেনি। মাগুরা জেলা প্রশাসনও এই শহীদের স্বীকৃতির বিষয়ে আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ গ্রহণ  করেনি। অথচ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে এই তরুণ রচনা করে গেছেন এক অন্যরকম ইতিহাস।  ২৫ মার্চের কালোরাত্রির পরপরই মাগুরার যে সব তরুণ সর্বাগ্রে অস্ত্রহাতে নিয়ে স্বদেশ ভুমির স্বাধীনতার জন্যে মা-বাবা, ঘর সংসার পেছনে ফেলে দেশের জন্যে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি তাদেরই একজন।

শহীদ শরীফুলের বাবার নাম মরহুম বিল্লাল হোসেন এবং মায়ের নাম মরহুমা সুন্দরী বেগম। ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার অন্য বড় দুই ভাইয়ের নাম মো. সাইদুর রহমান ওরফে সৈয়দ মাস্টার এবং মো. ওয়াজেদ আলী। বাড়ি মাগুরা জেলার পারনান্দুয়ালীর ব্যাপারীপাড়াতে। বড় সাহসী ছিলেন বলেই শরীফুল কৈশরে বেছে নিয়েছিলেন সৈনিক জীবন। ১৯৬৯ সালে তিনি তৎকালিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারী কোরে যোগদান করেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর প্রশিক্ষণের জন্যে চলে যান পাকিস্তানের কোহাটে। ওখানেই প্রশিক্ষণ নেন তিনি। কোহাট পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি জেলা, যেখানে রয়েছে বিশাল ক্যান্টনমেন্ট। মূলত দুই পাকিস্তানের যে-সব সৈনিকরা আর্টিলারি কোরে যোগ দিতেন মূলত তাদেরই দক্ষ প্রশিক্ষণ ওখানে হতো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে পাকিস্তানের কোহাট থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসেন সৈনিক শরীফুল। বাড়িতে এসে বিয়েও করেন সদর থানার পয়ারী গ্রামে। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ক্র্যাক ডাউন হলে শরীফুল দেশের জন্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। প্রথমেই তিনি নিজ গ্রামের আব্দুল ওয়াহেদ মিয়া (মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহেদ যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক ছিলেন), নুরুল চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন জনের সাথে পরামর্শ করতে থাকেন। এর মধ্যে ক্র্যাক ডাউনের পরপরই বৃহত্তর যশোর জেলার সেই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রুপকার মাগুরার কৃতি সন্তান আওয়ামী লীগ নেতা এমএনএ এডভোকেট সোহরাব হোসেনের নির্দেশ মোতাবেক শরীফুলের নেতৃত্বে একটি ছোট্ট সৈনিক দল পাঁয়ে হেঁটে শহরের ভায়না মোড় হয়ে যশোরের পথে রওয়ানা হন। প্রথমে তারা হাঁটতে হাঁটতে শালিখা থানার সীমাখালী বাজারে পৌছান। এর মধ্যে এই সশস্ত্র দলটির সাথে দেখা হয় ক্যাপ্টেন আব্দুল ওয়াহাবের। হাশিমপুর বাজারে গিয়ে কোনো এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন। এরপর যশোরে পৌঁছান শরীফুলসহ যোদ্ধা দলটি। এরপর একটি যুদ্ধে শরীফুল শহীদ হন।

শরীফুলেরসৈনিক জীবনের বন্ধু বরুনাতৈল গ্রামের গোলাম সরোয়ার জানান, একাত্তরের ৪ এপ্রিল শরীফুল তার সামনেই পাকসেনাদের গুলিতে শহীদ হন। ঘটনাস্থল থেকে তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এই ঘটনার আগে ও পরের স্মৃতি স্মরণে এনে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মাগুরার এমএনএ সোহরাব হোসেন সৈনিক শরীফুল, মান্নান এবং অন্যান্যদের সহ আমাকে তার শহরের বাসায় ডাকেন। এক পর্যায়ে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে ব্রিফ করেন। তিনি স্পষ্টভাষায় বলেন, এখন আর বসে থাকা চলবে না। বাঙালি সৈনিকদের এখনই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। একসময় আমাদের হাতে কিছু অস্ত্র তুলে দিয়ে বলেন, আমরা যেনো যশোর ইপিআরে গিয়ে যেনো আমরা রিপোর্ট করি। সোহরাব হোসেনের নির্দেশ মতো আমরা অস্ত্রসহ একটি দল যশোরের পথে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দিই। আমাদের নেতৃত্বে থাকে সাহসী সৈনিক শরীফুল। শালিখার সীমাখালি বাজারে গিয়েই আমরা দেখতে পাই ইপিআররা যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। এর মধ্যে বাঙালি তরুণ অফিসার ক্যাপ্টেন আব্দুল ওয়াহাব যার বাড়ি শ্রীপুরে তার সাথে আমাদের  দেখা হয়। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে একসময় আমরা যশোরের দিকে মুভ করি। বেশ কয়েকটা অপারেশনও অংশ নিই। এরমধ্যে শরিফুল, আবু, রহমান এবং আমি ইপিআর হেডকোয়ার্টারের দিকে চলে আসি। একাত্তরের ৪ এপ্রিল- শরীফুল শহীদ হন। এদিন সকাল দশটার দিকে আমরা সশস্ত্র অবস্থায় ইপিআর হেড কোয়ার্টার-এ থাকা অবস্থায় পাক সেনারা আমাদের এক পাশ থেকে বেপরোয়া আক্রমন শুরু করে। শরীফুল এবং আমি কাউন্টার আক্রমন করতে থাকি। এক পর্যায়ে শরীফুল গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়।’

মো. গোলাম সরোয়ারের মতে, শরীফুল ছিলো বাংলার এক সাহসী দামাল ছেলে। ওর আকাশ ছোঁয়া দেশপ্রেম ছিল বলেই সবার আগে রাইফেল হাতে শত্রু প্রতিরোধে ছুটেছিল। ওর দেশপ্রেমের তুলনা হয় না। শরীফুলের মেঝোভাই মো. ওয়াজেদ আলী বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ব্যবসায়িক কাজে তিনি গোয়ালন্দ চলে যান। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পাক সেনারা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ হত্যা শুরু করে। এ সময় তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে আসেন। কিন্তু বাড়িতে এসেই শুনতে পান ছোট ভাই সাহসী সৈনিক শরীফুল দেশ স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যশোরের দিকে চলে গেছেন। তারপর প্রিয় ছোট ভাই শরীফুল আর ফিরে আসেনি। পয়তাল্লিশ বছরেও তারা জানতে পারেননি শরীফুলকে কোথায় দাফন করা হয়েছিল।  মো. ওয়াজেদ আলী বলেন, একজন যোদ্ধা দেশের জন্যে জীবন দিল, কিন্তু স্বীকৃতি পেলনা-এটি খুবই দুঃখজনক। তিনি আপন ভাই শহীদ শরীফুলের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানান। শহীদ লুতাশ সংঘের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুজ্জামান বলেন, ‘শহীদ শরীফুলকে অবশ্যই শহীদ মুক্তিযেদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর আগে শহীদ লুতাশ সংঘের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনকে আমরা আবারো অনুরোধ করবো শহীদ শরীফুলের স্বীকৃতি দিতে তারা যেনো যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com