প্রথম পাতা » খেলাধূলা » আতাহার আলী খান: এক নিঃসঙ্গ শেরপা!

আতাহার আলী খান: এক নিঃসঙ্গ শেরপা!

আতাহার আলী খান: এক নিঃসঙ্গ শেরপা!

কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে সেই বিভৎস অবিচারে শিকার হওয়ায় পুরো বাংলাদেশ তখন ক্ষুব্ধ, হতাশ, বিস্মিত।

কেউ গালি দিচ্ছেন, কেউ অভিশাপ দিচ্ছেন, কেউ যুদ্ধ ঘোষনা করছেন।

আমরাও তখন ভুলে গিয়েছিলাম যে, আমাদের চেয়ে বেশী হতাশ, ক্ষুব্ধ হয়েছে মাঠে আমাদের হয়ে ওই অবিচারের মধ্যেও লড়ে আসা ছেলেগুলো। এই সময়ে যে ছেলেগুলোর পাশে দাড়ানো খুব জরুরী; খনিকের জন্য সবাই ভুলে গিয়েছিলাম।

একজন ভোলেননি।

আতাহার আলী খান। ফেসবুকে ঘোষনা দিয়েছিলেন, ‘ফলাফল যাই হোক, তোমরা বিজয়ী। আমি লাল গোলাপ নিয়ে বিমানবন্দরে হাজির হবো।’

তারপর অনেক সন্ধ্যা কেটে গেছে। আতাহারের এই কথা ভুলে গিয়েছিলাম।

বাংলাদেশ দলের বিমান যখন রানওয়ে স্পর্শ করলো, তখনও মনে ছিলো না আতাহারের এই প্রতিশ্রুতির কথা। ইনফ্যাক্ট আতাহারকে খেয়ালও করিনি সেদিন বিমানবন্দরেন।

মাশরাফিরা আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলো। চারিদিকে ফ্লাশ লাইট ঝলসাচ্ছে, ক্যামেরাম্যান-সাংবাদিকদের হুড়োহুড়ি, কর্মকর্তাদের চিৎকার, নিরাপত্তাকর্মীদের ছোটাছুটি; সব এক লহমার জন্য থেমে গেলো একটা চিৎকারে, ‘ম্যাশ! ম্যাশ, আই অ্যাম হেয়ার। কংগ্রাচুলেশনস!’

আতাহার আলী খান!

চিরকালের আতাহার আলী খান। ড্যাশিং. আল্ট্রা স্মার্ট, প্রায় ইংরেজী ভাষী, দীর্ঘদেহী, গৌরবর্ণ এবং হাতে একটা ছোট্ট লাল গোলাপ; আতাহার আলী খান।

আমি ঢাকার ছেলে নই।

ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে অলরাউন্ডার আতাহারের প্রেমে পড়ার কোনো সুযোগ আমার ছিলো না; যে আতাহারের গল্প করে শুভ্রদা প্রায়ই বলতেন, ‘আতাহার বাংলাদেশের সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর ব্যাটিং অলরাউন্ডার। প্রয়োজনের সময় এতো চমৎকার সিম মুভমেন্ট করাতে পারে; প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো। আর ব্যাটিংটা নাই বা বললাম।’

আমি অবশ্য প্রেমে পড়লাম ওই ব্যাটিং দেখে।

নব্বইয়ের এশিয়া কাপ সম্ভবত। শ্রীলঙ্কার বেশ বড় একটা টার্গেট চেজ করতে নেমেছিলো। বাংলাদেশ যথারীতি শুরুতেই পট পট কয়েকটা উইকেট হারিয়ে ফেললো।

চেয়ারম্যান বাড়িতে বসে টিভিতে খেলা দেখছিলাম। স্টিল আমার এটা মনে আছে যে, খুব লম্বা একটা মানুষ, ভেরি আনলাইক বাংলাদেশী, ব্যাট করতে নামলো। জায়গায় দাড়িয়ে একটা পা সামনে নিয়ে কেমন যেন একটা শট করেছিলো; চার হয়েছিলো; এখন জানি, ওটা সম্ভবত কাভার ড্রাইভ ছিলো।

সেটা ছিলো আমার প্রথম কাভার ড্রাইভ প্রেম এবং পরে বুঝেছি আতাহার প্রেম।

৭৮ রানে (রানটা তখনকার স্মৃতিতে ছিলো না) অপরাজিত থাকা আতাহারকে শ্রীলঙ্কানরা পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে; এটা সম্ভবত ক্রিকেট বিষয়ক আমার আদিমত স্মৃতি।

এরপর ১৯৯৭ এশিয়া কাপে আরেকটা ইনিংস। এটার একেবারে খুটিনাটি মনে আছে। বাংলাদেশ আতাহারের হাত ধরে প্রথম সেঞ্চুরি পেতে যাচ্ছে; আমরা থর থর করে কাঁপছি। কী স্টাইলিশ ব্যাটিং। সেঞ্চুরি হবেই।

হলো না। বাংলাদেশী এক থার্ড আম্পায়ার বেনিফিট অব ডাউট দিলেন বোলারকে; স্ট্যাম্পিং হয়ে ৮২ রানে ফিরেছিলেন আতাহার। আমি সেই আম্পায়ারকে অনেকবার পরে সামনাসামনি দেখেছি এবং ঘৃণা প্রকাশ করেছি মনে মনে।

আতাহার বিষয়ক ভালোবাসা এবং ঘৃণা সবটাই মনে মনে থেকে গেলো।

এই যে আতাহার ভাইয়ের লম্বা লম্বা ইন্টারভিউ নেই, ছোট ছোট আড্ডা দেই, একটা-দুটো টক শোতে দেখা হয়; কখনো এই ভালোবাসাটার কথা বলা হয়নি তাকে।

আমার মনে হয়, সেটা আতাহারের জন্য নতুন কিছু হতো না।

তাদের প্রজন্মের অনেক ক্রিকেটারই আতাহারের চেয়ে বড় তারকা হয়েছেন। কিন্তু আজকের প্রজন্মের দর্শকদের কাছে আতাহার এখনও জীবন্ত এক নায়ক। সেটা ওই সময়ের খেলার জন্য যতো না; তার চেয়ে অনেক বেশী তার যোদ্ধা ইমেজের জন্য।

খেলা ছাড়ার পর চোস্ত ইংরেজী ও দারুন ও বিশ্লেষনী ক্ষমতার সুবাদে ধারাভাষ্যকার হয়ে গেছেন।

আর ধারাভাষ্যকার হিসেবেই এক নিঃসঙ্গ শেরপা হিসেবে বেয়ে চলেছেন পর্বতের পর পর্বত। কমেন্ট্রিবক্সে তার প্রতিদিনের এই একক যুদ্ধ আতাহারকে এক নতুন নায়কে পরিণত করেছে।

আতাহারের মতোই নিঃসঙ্গ আরেক যোদ্ধা শামীম আশরাফ চৌধুরী এই পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পরও বলছিলেন, তাদের এই বছরের পর বছর ধরে সহ্য করা গ্লানি ও বিরুদ্ধ পরিবেশের কথা, ‘`জীবনের বড় একটা সময় ধরে কী অপমান সহ্য করে, জীবিকার জন্য, ক্রিকেটের জন্য কী ভয়ঙ্কর অপমান সহ্য করে গেছি, আজ বলে বোঝাতে পারবো না। এই রকম একটা সময় একদিন আসবে বলেই আমি বেচে ছিলাম। আর দশটা মানুষের সেই পরাজয়ের যন্ত্রনা থেকে পালানোর উপায় থাকে, আমাদের সে উপায় ছিলো না।’

মজার ব্যাপার হল, আতাহার নিজে কখনও এসব নিয়ে আফসোস করেননি। অনেক কিছু নিজের কানে শুনেছি, অনেককিছু দেখেছি।

মুলতান টেস্টে রশীদ লতিফ যখন অলক কাপালির ক্যাচ নিয়ে মিথ্যে দাবি করেছিলেন, আতাহার সেখানেই চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘এটা অন্যায়’।

রমিজ রাজা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘টিপিক্যাল বাংলাদেশী স্টাইল।’

আর আতাহার বলেছিলেন, ‘অ্যান্ড লতিফ ডিড হোয়াট ইস টিপিক্যাল পাকিস্তানী স্টাইল।’

আতাহার জবাব দিয়েছেন, লড়েছেন; কিন্তু কমেন্ট্রিবক্সের বাইরে কখনো এসব নিয়ে অভিযোগ করেননি, অনুযোগ করেননি। আমার কেন যেন মনে হয়, আতাহার সবসময় বোধ করেছেন, তাদের গঞ্জনা নিয়ে অনুযোগ করলে সেটা খেলোয়াড়দের বিপক্ষে যায়। খেলোয়াড়রা পারেন না বলে তারা গঞ্জনা পান; এটা কখনো আতাহার প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি।
এটাই আতাহারকে অনন্য করে তুলেছে।

আতাহার জুনিয়র ক্রিকেটারদের যেভাবে সম্মান জানাতে পারেন, তা কেবলই অনুকরণীয় হতে পারে। ম্যানেজার হিসেবে বয়সভিত্তিক দলে কাজ করেছেন, নির্বাচক ছিলেন জাতীয় দলে। ঘটনাচক্রে বর্তমান দলের প্রায় সব খেলোয়াড় আতাহারের অধীনে এই সময়গুলোতে উঠে এসেছেন।

আতাহার চাইলে এদের অন্য সিনিয়রদের মতোই ‘তুমি-তুমি’ করতে পারেন; ‘তুই’ বললেই বা মারে কে! অন্তত মিডিয়ায় আতাহারকে কখনো কোনো ক্রিকেটার সম্পর্কে ‘তুমি’ বাচক শব্দ বলতে শুনিনি। সবসময় ‘উনি, ওনারা, বলেছেন’ এই শব্দচয়ন করে কথা বলেন।

এই হলেন আতাহার; এখানেও তিনি একা এবং নিঃসঙ্গ। এখানেও তিনি দৃষ্টান্তস্থাপনকারী।

হঠাৎ আতাহারকে নিয়ে লিখতে বসলাম কেন?

আতাহার তো আছেন, খুব দাপটের সঙ্গেই আছেন। আমাদের দেশে তো জীবিত ও কর্মক্ষম লোকেদের নিয়ে প্রশস্তি করার রেওয়াজ নেই। তাহলে কেন আতাহারকে নিয়ে লিখছি!

কারণ, আতাহারদের নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের সময়টা শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। রাত কেটে যাচ্ছে। মাশরাফিরা ভোরের আলো দেখাতে শুরু করেছেন।

দিনের আলোয় আস্তে আস্তে আতাহারের সঙ্গী বাড়বে। গৌরবের দিনে আস্তে আস্তে সাফল্যের ভাগিদার হতে অনেকে আসবেন। অনেকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবেন বাংলাদেশের রিচি বেনো, টনি গ্রেগরা। তারা আতাহারের চেয়ে ভালো ইংরেজীতে ভালো বিশ্লেষনে মন ভরিয়ে দেবেন।

কিন্তু হাজারটা রিচি বেনো এসেও আমাদের একটা আতাহার হতে পারবেন না; একটা পর্বতে ওঠার শেরপা হতে পারবেন না। সেই আতাহারকে সময়মতো বাঁধিয়ে রাখলাম।

– See more at: http://www.priyo.com/blog/2015/05/22/1490149#sthash.TIk5ToMr.dpuf

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com