প্রথম পাতা » ফিচার » মাগুরার কৃতিসন্তান ক্রীড়াসাংবাদিক জীবন বোস বেঁচে থাকবেন আজীবন

মাগুরার কৃতিসন্তান ক্রীড়াসাংবাদিক জীবন বোস বেঁচে থাকবেন আজীবন

মাগুরার কৃতিসন্তান ক্রীড়াসাংবাদিক জীবন বোস বেঁচে থাকবেন আজীবন

জাহিদ রহমান: ৮ মে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন বর্ষিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক জীবন বোস। জীবন বোস-এর জন্ম মাগুরাতে। ১৯৪৩ সালের ৩১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শালিখা থানার ধনেশ্বরগাতী গ্রামে। তবে পাকিস্তান আমলে তাঁর পরিবার তৎকালীন মাগুরা মহকুমার ধনেশ্বরগাতি থেকে স্থানান্তরিত হয়ে চলে যান যশোর শহরে। যশোরের লোন পাড়াতে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেন তার বাবা। ফলে যশোর শহরেই বড় হন তিনি, লেখাপড়াও ওখানে করেন। যশোর সম্মিলিনী ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক ক্লাস পাশ করে যশোর এমএম কলেজে লেখাপড়া করেন। এদিকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধে নিয়োগ করেন। ভারতে যান প্রশিক্ষণ নিতে। ফিরে এসে যশোরের সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। মু্িক্তযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিনি যশোরের হাশিমপুর স্কুলে বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কৈশর-তারুণ্য পেরিয়ে অনেকেই জীবন-জীবিকার খোঁজে এদিক-ওদিক গেলেও তিনি আর কোথাও যাননি। যশোরকে ভালোবাসতেন বলে যশোরেই থেকে যান আজীবনের জন্যে।
চার ভাইবোনের সংসারে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বছর পাঁচেক আগে সু-ক্রীড়ালেখক জীবন বোস রোগাক্রান্ত হন। শরীরে পানি জমে গেলে হাঁটা চলা দায় হয়ে পড়ে। বলা যায় সেই থেকে জীবনের শেষ দিনটি তাঁকে বিছানোতেই কাটাতেই থাকেন। ৮ মে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। মৃত্যুঅব্দি যশোর শহরে বসবাস করেও বর্ষিয়ান ক্রীড়ালেখক-ধারাভাষ্যকর জীবন বোস শুধু ক্রীড়ালেখনির মাধ্যমে নিজের পরিচিত ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন সারাদেশে। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় তিনি নিজেকে এতোটাই সমর্পিত করেছিলেন যে-এর বাইরে আর কিছুই ভাবতেন না। ক্রীড়া পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন এক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব। স্বভাবতই তাঁর চিরপ্রস্থান ক্রীড়ালেখক আর ক্রীড়ামোদীদের হ্নদয়ে কিছুটা হলেও রক্তক্ষরণ না করে পারেনি। করারই কথা। ক্রীড়াই কতো না আত্মনিবেদিত ছিলেন তিনি। ক্রীড়া নিয়ে মাতোয়ারা থাকার কারণে ঘরসংসারটাও করা হয়নি তার। চিরকুমার ছিলেন। ক্রীড়ার আদ্যপান্ত অনুসন্ধানীজন ‘জীবন দা’ চলে গেলেও রেখে গেছেন মোহনীয় এক সুরভী। ক্রীড়ালেখক জীবন বোসকে কে না চিনতো। ক্রীড়া, ক্রীড়ার বাইরের মানুষ সব আমজনতা তাঁকে চিনতেনÑ শুধু তার নামটির কারণেই। একটি মফস্বল শহরে বসে জীবন বোস তথা আমাদের প্রিয় জীবন দা খেলাধুলো নিয়ে যেভাবে জীবন অব্দি লিখে গেছেন তা অনেকেই পারেননি।
ক্রীড়ালেখক হিসেবে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক আজাদ,  দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, পাক্ষিক ক্রীড়াজগতে কাজ করেন। এ ছাড়া যশোরের দৈনিক ঠিকানা, দৈনিক কল্যাণ ও দৈনিক রানার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির জীবন সদস্য। ২০০৮ সালে ক্রীড়ালেখক সমিতি তাঁকে সম্মাননাও প্রদান করেন। দেশের প্রায় সব পত্রিকাতেই তাঁর লেখা ক্রীড়া বিষয়ক ফিচার ছাপা হয়েছে। তবে আশি এবং নব্বই-এ দশকে ক্রীড়া জগতের প্রতিটি সংখ্যাতেই যশোর-খুলনার ক্রীড়া বিষয়ক লেখা একটা না একটা থাকতোই। এখানেই শেষ নয়। যৌবনে জীবন বোস ক্রিকেট এবং ফুটবল দুই-ই খেলতেন। তবে  জীবন বোস লেখালেখির জগতে আসেন যশোরের আরেক প্রয়াত ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আতাউল হক মল্লিকের অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতায়। কলেজে তাঁরা দুজন ছিলেন সমসাময়িক। আতাউল হক মল্লিক এক ক্লাস উপড়ে পড়তেন। কিন্তু এমএম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দুজনে একই বছরে সম্পন্ন করেন।
ভীষণ মিশুক এবং প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন জীবন বোস। সাংবাদিকতার পাশাপাশি আড্ডা মারতে খুব পছন্দ করতেন। আর তাই সেই পাকিস্তান আমল থেকে যশোরের ঐতিহ্যবাহী মধু সুইটস- এ যে আড্ডা হতো সেই আড্ডার অন্যতম মধ্যমণি ছিলেন তিনি। মধু সুইটস-এ তাদের আড্ডার অন্যতম সাথী ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিক-সাবেক মন্ত্রী খালেদুর রহমান টিটো, সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, ফুটবলার এবং ক্রীড়া সংগঠক মো. শফিকুজ্জামান, আলাউদ্দিন খান, খান মাহমুদুল হক, মকসুদুর রহমান সহ আরো অনেকে। যশোরের একসময়ের প্রখ্যাত ফুটবলার মো. শফিকুজ্জামান এবং জীবন বোস ছিলেন আজন্ম বন্ধু। দুজনে স্কুল এবং কলেজে একই সময়ে লেখাপড়া করেন। যৌবনে একজন খেলোয়াড় এবং একজন ক্রীড়ালেখক হওয়ার কারণে তাদের বন্ধুত্বের বন্ধনও ছিলো অন্যরকম। একে অপরের সুখে-দুঃখে থেকেছেন দুজন। সাবেক ফুটবলার শফিকুজ্জামান স্মৃতিচারণে বলেন, ‘কৈশর-তারুণ্যে আমাদের দুজনের মধ্যে যে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল তা সারাজীবনই থেকেছে। মৃত্যুর শেষ দিনেও ওর পাশে ছিলাম।’ প্রিয় বন্ধুর মূল্যায়নে শফিকুজ্জামান বলেন, ‘জীবন বোস ছিলেন এক পরিচ্ছন্ন সব্যসাচি মানুষ। জীবনে খুব বেশি চাওয়া পাওয়া ছিল না তার। মানুষের মঙ্গল কামনা করেছেন সবসময়। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত মেতে থেকেছেন ক্রীড়াবিষয়ক লেখালেখি নিয়ে। ত্যাগের এক অনুপম অবদান রেখে গেল সে।’ শফিকুজ্জামানের মতে জীবন বোস জীবনে কিছুই চাননি। মানুষের কল্যাণেই তিনি ছিলেন সমর্পিত। আর তাই টাকার পেছনে কখনই ছুটেননি। অল্পতেই তুষ্ট থেকেছেন। জীবনকে কখনই জটিল কুটিল করেননি।
ক্রীড়ালেখক জীবন বোসÑ জীবনে অনেক কিছুই হতে পারতেন, হননি। তিনি কেবলই লেখক হতে চেয়েছিলেন। তাও ক্রীড়ালেখক- আর কিছু নয়। হয়েছিলেনও তাই। ক্রীড়াই ছিল তার জীবনের সবকিছু। খুলনা এবং যশোরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে খেলাধুলো হয়েছে সেখানেই তিনি ছুটে গিয়েছেন। তারপর পরম মমতায় খবরগুলো লিখে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাঠিয়েছেন। এ কারণে সবার কাছে তিনি ক্রীড়ালেখক হিসেবেই অমর হয়ে থাকলেন। মৃত্যু তাঁকে নিয়ে গেলেও তিনি সু ক্রীড়ালেখক হিসেবে বেঁচে থাকবেন আজীবন। চিরকুমার, পরিচ্ছন্ন এবং নিরংহকারী জীবনের এই মানুষটি নতুন প্রজন্মের জন্যে রেখে গেলেন একখন্ড ভালোবাসার রোদ্দুর। জীবন দা সবসময় বেঁচে থাকবেন আমাদের জীবনে।
জাহিদ রহমান: সম্পাদক, মাগুরা প্রতিদিন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com