প্রথম পাতা » মুক্তিযুদ্ধ » অধিনায়ক আকবর হোসেন : মুক্তিযুদ্ধের এক কিংবদন্তীর প্রস্থান

অধিনায়ক আকবর হোসেন : মুক্তিযুদ্ধের এক কিংবদন্তীর প্রস্থান

অধিনায়ক আকবর হোসেন : মুক্তিযুদ্ধের এক কিংবদন্তীর প্রস্থান

গত ২ মে না ফেরার দেশে  চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তী, এক স্পর্ধিত ইতিহাস, বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা অধিনায়ক আকবর হোসেন। মৃতুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। মৃত্যুঅব্দি তিনি ছিলেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। একাত্তরে তৎকালীন মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার নিজগ্রাম টুপিপাড়া-খামাড়পাতে একহাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে এক বিরাট আঞ্চলিকবাহিনী গড়ে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছিলেন অধিনায়ক আকবর হোসেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর নিজস্ব বাহিনী প্রথমে ৮ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুর কর্তৃক ‘শ্রীপুরবাহিনী’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলেও পরবর্তীতে এই বাহিনী তাঁর নিজ নাম ‘আকবরবাহিনী’ হিসেবেই সাধারণ্যে জনপ্রিয় ও পরিচিতি লাভ করেছিল। মাগুরা, ঝিনেদা, যশোর, কুৃষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ পরিবারের মুক্তিযোদ্ধারা ছিল এই বাহিনীর সক্রিয় সদস্য। সাহসী আকবর হোসেন সাধারণ পরিবারের তরুণদের সংগঠিত করেই পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।

বেশ কিছুদিন ধরেই অধিনায়ক আকবর হোসেন অসুস্থ ছিলেন। সর্বশেষ অসুস্থ অবস্থায় যশোরের কুইন্স হাসপাতালে ভর্তি হন। ওখানেই ২ মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঐদিনই তাঁকে আনা হয় নিজবাড়ী খামারপাড়াতে। পরেরদিন সকাল ১১টায় কয়েকশত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অনুসারীদের উপস্থিতিতে তাঁর নামাজে জানাযা সম্পন্ন হয় খামারপাড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। জানাযা শেষে তাঁকে দাফন করা হয় খামারপাড়াস্থ পারিবারিক গোরস্থানে। তাঁর জানাযায় সেদিন মানুষের ঢল নেমেছিল। শতসহ্রস মুক্তিযোদ্ধা আর সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছিলেন ঝিনেদা, যশোর, রাজবাড়ি, ফরিদপুর অঞ্চল থেকে। প্রিয় অধিনায়ককে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন অগুনতি সাধারণ নারী-পুরুষ। জানাযায় সমবেত হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিই সেদিন প্রমাণ করে অধিনায়ক আকবর হোসেন কতোটা সাধারণ মানুষের কাছে শ্রদ্ধেয় এবং জনপ্রিয় ছিলেন।

যুদ্ধকালীন সময়ে যশোর জনপদের অন্যতম একটি মহকুমা ছিল মাগুরা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই আকবর হোসেন মাগুরার শ্রীপুরে এক বিশাল সুশৃঙ্খল আঞ্চলিক বাহিনী গড়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের সে খবর তখন বিবিসিসহ বিশ্বমিডিয়াতেও ফলাও করে প্রচার হয়েছিল। একের পর এক নিজ এলাকার বাইরে গড়ে উঠা পাকবাহিনী এবং রাজাকারদের ঘাঁটি গুড়িয়ে দিয়ে আকবর হোসেন  মুক্তিকামী সাধারণ জনতার হ্নদয়ে সমাাসীন হন। এখানে উল্লেখ্য শুধু তাঁর বাহিনীর কারণেই সে সময় শ্রীপুরে পাকবাহিনী এবং রাজাকাররা কোনো ধরনের ক্যাম্প গড়ে তুলতে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হন।

এই অনন্য তেজদীপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মগ্রহণ করেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়া গ্রামে। শ্রীপুর উপজেলা মাগুরা সদর উপজেলা থেকে পনোরো কিলোমিটার উত্তরে। প্রথম জীবনে আকবর হোসেন পাকিস্থান বিমান বাহিনীতে চাকরি নিলেও পাকিস্থানীদের বৈষম্যমূলক আচারণের প্রতিবাদ করে ৫৪ সালের ৮ আগস্ট চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিজ গ্রামে চলে আসেন। এরপর তিনি স্থানীয় সাধারণ মানুষের সেবা করার অভিপ্রায়ে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের থানা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে তিনি নিজ ইউনিয়ন শ্রীকোলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং টানা ২৪ বছর স্বপদে থাকার অনন্য কৃতিত্ব দেখান।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে আকবর হোসেন মিয়া সহযোদ্ধাদের নিয়ে শ্রীপুরেই ছিলেন। যুদ্ধের জন্যে মানসিকভাবে তিনি তৈরিও হয়ে থাকেন। ২৫ মার্চ রাতে পাক আর্মিরা ঢাকায় নিরীহ বাঙালির ওপর অতর্কিত হামলা চালালে মাগুরা শহর অরক্ষিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মাগুরার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও মাগুরা ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। কিন্তু রুখে দাঁড়ান আকবর হোসেন। পরিবার পরিজনকে ফেলে রেখে শুধু দেশপ্রেশের কারণে জীবনকে হাতের মুঠোয় ধরে নিজ থানা শ্রীপুরের খামারপাড়া গ্রামের খন্দকার সুজায়েত, মৌলভী নাজায়েত, বরিশাট গ্রামের মোল¬া নবুয়ত আলী, শ্রীপুরের জোয়ার্দ্দার আ. রহিম, কাজলীর মোল্লা সাহাদত হোসেনসহ আরো অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে মাগুরার সর্বত্র পাক হানাদারদের প্রতিরোধের পরিকল্পনা নেন। এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি দল নিয়ে প্রথমে মাগুরাস্থ আনসার ক্যাম্প দখলে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরু করেন। মুহুর্তেই আকবর হোসেনের সাহসী নেতৃত্বের কথা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। মাগুরার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তরুণরা এসে তাঁর দলে ভীড় জমাতে থাকে। দ্রুতই তিনি মাগুরার মুক্তিযদ্ধের স্বপক্ষের দেশপ্রেমিক সাধারণ জনতার কাছে এক অন্যরকম আস্থায় পরিণত হন। এদিকে তিনি সহসাই কাছে পান একদল সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- শ্রীকোলের মো. আনারুদ্দিন শেখ, বেলনগরের মো. বদরুল আলম, খামারপাড়ার সহোদর খন্দকার আবু  হাসান এবং আবু হোসেন, টুপিপাড়ার আব্দুল ওয়াহাব মিয়া, হরিন্দির নজরুল ইসলাম রাজু, শ্রীপুরের জহুরুল আলম মুকুল (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ) নহাটার মনোয়ার হোসেন, বিলনাথরের আ. রশিদ, হাবিলদার শাজাহান, গোলাম মোস্তফা, পারনান্দুয়ালীর সুধীর (গেরিলা) সহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে, যারা সাহসে বীরত্বে ছিলেন সবসময়ই অগ্রগ্রামী।

পাকবাহিনীর সামনে দ্রুতই আকবর বাহিনী দারুণ এক ভীতি হিসেবে পরিগণিত হয়। একর পর এক আক্রমণ চালিয়ে হানাদারদের দুর্গ ভেঙে ফেলে এই বাহিনীর যোদ্ধারা। বিশেষ করে শ্রীপুর থানা দখল, শৈলকুপা থানা আক্রমণ, রাজবাড়ির বালিয়াকান্দির রামদিয়াতে পাকসহযোগী চাঁদ খাঁর বাড়ি আক্রমণ, ইছাখাদা ও মাগুরা আনসার ক্যাম্পে হামলা, আলফাপুরের যুদ্ধ, নাকোলের যুদ্ধ এবং বিনোদপুর রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ-এ সবই আকবর হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এখানে উলে¬খ্য অক্টোবরে বিনোদপুরের যুদ্ধে এই বাহিনীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা জহরুল আলম মুকুল পাক রেঞ্জার পুলিশের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আকবর হোসেন এবং তাঁর বাহিনীর অবদান অসামান্য। যুদ্ধের নয়মাস আকবর হোসেন যেভাবে যোগ্য, দক্ষ, অনন্য নেতৃত্ব দিয়ে তার সুশৃঙ্খল আঞ্চলিক বাহিনী পরিচালনা করেন তা দৃশ্যত বিরল এবং অভাবনীয়। শুধু পাকবাহিনী আর তার সহযোগীদের প্রতিরোধ বা পরাস্ত নয়, দস্যু ডাকাতদেরও তিনি শক্ত হাতে দমন করে এলাকার সাধারণ মানুষের জান মাল রক্ষা করেন। আকবর হোসেন আরো খ্যাত তিনি ব্যক্তিস্বার্থকে কখনই প্রাধান্য দেননি। তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ও কাছে থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে তিনি কোনো ধরনের সুবিধা যেমন নেননি, তেমনি প্রশয়ও দেননি। মৃত্যু অব্দি তিনি সেই বিশ্বাসেই অটল থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন-মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী শিরোনামে একটি বই।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতৃত্বে তিনি যেমন ছিলেন এক অনুকরণীয় চরিত্র তেমনি আপাদমস্তক সৎ সজ্জন হিসেবে মানুষের কাছে ছিলেন নমস্য। একইসাথে ছিলেন রুচিশীল, আধুনিক এবং স্বপ্নবাদী অসাম্প্রদায়িক এক মানুষ। বয়সের ভারে ন্যুজ্জ হলেও থেমে থাকতেন না।  সবসময় কাজ করতে ভালোবাসতেন। নতুন নতুন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা করার স্বপ্ন দেখতেন। তরুণদেরও সেইভাবে উদ্বীপ্ত করতেন, অনুপ্রেরেণা দিতেন। আলোকিত সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যেই তিনি এলাকায় একাধিক কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। সততা এবং সত্যবাদীতায় তিনি ছিলেন অনন্য। দলীয় বৃত্তে কখনই বন্দী থাকেন নি।  আর তাই মৃত্যু অব্দি সৎ এবং সততার মহান পুরস্কার নিয়েই তিনি চিরকালের জন্যে বিদায় নেন।

ভীষণরকম প্রজ্ঞাবান এবং পরহেজগার মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও তিনি কখনও একরাকাত নামাজও বাদ দেননি। যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময় টুপি পরিহিত অবস্থায় থাকতেন। অনেকসময় তাই পাকসেনারা তাঁকে চিনতে পারতো না। মুক্তিযুদ্ধের যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ছিল তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে সম্পূর্ণরুপে প্রতিফলিত ছিল। কখনই তাই মিথ্যার কাছে নত স্বীকার করেননি। কখনই ন্যায়নীতিকে বিসর্জন দিয়ে নিজের জন্যে সামান্যতম লাভ খুঁজতে যাননি। যখনই যা করেছেন সেটা এলাকাবাসীর কল্যাণেই করেছেন। ন্যায় নায্যতার প্রশ্নে কখনই আপোষ করেন নি। লাভ খুঁজেননি বলেই সাধারণ মানুষের মতো তিনি ভ্যানে চড়ে চলাফেরা করতেন।

লম্বা শুশ্রমন্ডিত অধিনায়ক আকবর হোসেন ছিলেন সত্যিই বাংলাদেশেরই এক প্রতিচ্ছবি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি মাথা উঁচু করে হাঁটতেন। কথা বলতেন দৃঢ়তার সাথে। বুঝা যায়, একাত্তরে এই মানুষটি কতোটা সাহসী ছিলেন। তাঁর অপরীসিম ত্যাগ আর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে এই বাংলাদেশে। কিন্তু এই মানুষটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে সেই ভালোবাসার যথার্থ মূল্যায়ন পাননি। তবে তিনি জনগণের ভালোবাসা পেয়েছেন। তাঁর শেষযাত্রার হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে- তিনি কতোটা প্রিয় ছিলেন সবার কাছে।

জাহিদ রহমান: সাংবাদিক, গবেষক
zahidrahman67@gmail.com

মন্তব্য (2)

  1. saeed Anwar says:

    #জাহিদ ভাই লেখাটা খুব সুন্দর হয়েছে।

  2. Jahid Arman says:

    Eai likhata khub valo hoyse . Amader sobar hounarable Akbar Dada k Allah jeno Jannat nosib koren. Akbar Dadar sorboda valo manushita jeno sobar poth cholar patheo hoy. Amin.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com