প্রথম পাতা » মতামত » ডা. এমএস আকবর এমপি: কে আর রেখেছে তারে মনে

ডা. এমএস আকবর এমপি: কে আর রেখেছে তারে মনে

ডা. এমএস আকবর এমপি: কে আর রেখেছে তারে মনে

দেখতে দেখতে তিন মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেল জনপ্রিয় মানুষ মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ডা. এমএস আকবর এমপি আমাদের মাঝে নেই। এ বছরের ৯ মার্চ চিরকালের প্রস্থানের মধ্য দিয়ে এক দারুণ শূন্যতা রেখে গেছেন তিনি। স্বভাবতই অনেকের মতো আমিও তাঁর শুন্যতা অনুভব করি সবসময়। বেঁচে থাকাকালীন সময় কারণে অকারণে প্রায়শই তাঁর সাথে দেখা হতো। নানা বিষয়ে কথা হতো। অদ্ভুত এক রসিকতায় জমিয়ে রাখতেন তিনি। কথা বলতেন নিজস্ব এক ঢং-এ। হিউমার ছাড়া তিনি কথা বলতে পাতেন না। অনেক কঠিন কথা যেমন রসিয়ে বলতেন তেমনি আবার সহজ কথাও। তাঁর অনেক ডায়লগ তাই ‘ট্রেডমার্ক’ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কথায় রাখ ঢাক থাকতো না। মুখের উপর উচিত কথা বলতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে পারঙ্গম।
ডা. এমএস আকবর এমপি জনপ্রিতিনিধি হওয়ার আগে রাজনীতিবিদ বা নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। একজন চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সে পরিচয়ও যে বৃহৎ পরিসরে ছিল তা নয়। তবে ৯৬ সালে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার তাঁর পরিচিতি সাধারণ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মনে পড়ে মাগুরার রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েই সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। ৯৬ সালে অকস্মাৎই তিনি মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন এবং প্রথমবারেই জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিজয়ের এক নতুন চমক উপহার দিয়ে যেমন জনতার কাতারে আসীন হন তেমনি প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মাগুরা-১ আসন উদ্ধার করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এক নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেন।
মূলত ৯১-এর নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে বিএনপির অন্যতম শীর্ষনেতা মে. জে. (অব.) এম মজিদ উল হকের কাছে আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলতাফ হোসেনের পরাজয়ের পর স্থানীয় রাজনীতিতে নানান সমীকরণ তৈরি হয়। পরাজয়ের বৃত্ত থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও মাগুরা আওয়ামী লীগকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। একসময় সমাগত হয় সপ্তম সংসদ নির্বাচন। এ সময়ই মাগুরা-১ আসনে আওয়ামী লীগের নবাগত প্রার্থী হিসেবে তাঁর আগমন বার্তা বেজে উঠে।
৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। প্রথমবারেই তিনি নির্বাচিত হয়ে দারুণ এক চমক দেখান। দীর্ঘ ২৩ বছর পর সর্বশেষ আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হওয়া মাগুরা ১ আসনটি পুণরুদ্ধার হয় তাঁর হাতেই। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ডা. এমএস আকবরের নাম। সেবার তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৭৩,৪৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এদিকে ২০০১ সালের নির্বাচনেও ডা. এমএস আকবর ফের চমক দেখান। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষনেতা পরাজিত হলেও তিনি ৮৭,৫৪২ ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থী নিতাই রায় চৌধুরীকে পরাজিত করেন। নিতাই রায় চৌধুরী ৮৬,৪৬৮ ভোট পান। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাগুরা-১ আসন থেকে মহাজোট প্রার্থী ডা. এমএস আকবর ১,৩৫,৫৯৬ ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থী ইকবাল আখতার খান কাফুরকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে হ্যাট্টিক জয়ের রেকর্ড করেন। ২০০৮ সালের ভোট যুদ্ধে বিএনপি প্রার্থী ইকবাল আখতার খান কাফুর পান ১,০৯,৮৩৫ ভোট। এই ধারাবাহিকতায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ৫৬ হাজার ৭৩ ভোট পেয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ডা. এমএস আকবর এমপি যাঁকে আমি ‘মামা’ বলে সম্বোধন করিতাম তিনি জনগণের নেতা হিসেবে কতোটা স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন সেটা ইতিহাস বলবে তবে ডাক্তার হিসেবে তিনি যে মাগুরার মাটি ও মানুষের মন জয় করতে পেরেছিলেন, সবার শ্রদ্ধার পাত্র হতে পেরেছিলেন সেটা সর্বাংশে সত্য। তিনি মাগুরাতে গেলে দেখতাম তাঁর বাসাতে সাধারণ মানুষের ঢল । অজানা অচেনা দূরগ্রাম থেকে দরিদ্র নারীরা তার সামান্য স্বাস্থ্যসেবা নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। যতবার তার বাসায় গিয়েছি ততবারই এই দৃশ্য অবলোকন করার সুযোগ হয়েছে। দরিদ্রজনদের কাছ থেকে শুনেছি-স্পষ্টভাষী ডা. এমএস আকবরের চিকিৎসায় বহু শিশু রোগমুক্ত হয়েছেন। হয়ত এ কারণেই ডা. এমএস আকবর নির্বাচনে দাঁড়ালে ভোটের বাক্স তাঁকে বিমুখ করতো না। ডা. এমএস আকবর এমপির মৃত্যুর পর তাঁর বাড়িতে এখন আর কোনো সাধারণ জনের দেখা মেলে না। বাড়িটিতে এক শূন্যতা । ‘এমপি সাহেব’ কবে আসবেন এই প্রশ্নও আর কারো নেই। তবে বুঝতে পারি মাগুরার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামের সেই দরিদ্র অসহায় মানুষেরা এখনও ডা. এমএস আকবরকে খুঁজেন। তাঁর জন্যে অনেকেই চোখের পানি ফেলেন। নেতা কর্মীরা তাঁকে ভুলে গেলেও সাধারণ মানুষেরা তাঁকে ভুলেননি।

–জাহিদুল আলম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com