প্রথম পাতা » Featured » স্বপ্নের ফেরিওয়ালা গোপালদা

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা গোপালদা

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা গোপালদা

কখনো পিঠে। কখনো মাথায়। আবার সুযোগ হলে ভাড়া করা ভ্যানগাড়িতে আইস ক্রিমের বাক্স নিয়ে ওই যাচ্ছেন গোপাল দা। স্বাভাবিক চলাফেরা। আর এই ভাবেই কাটিয়ে দিলেন প্রায় পঞ্চাশটি বছর। ৫ পয়সা দামের লাল রংয়ের আইসক্রিম দিয়ে যার ব্যবসা শুরু। কে খায়নি গোপালদার আইসক্রিম। লাল, সুবজ। সাদা রঙের দুধ মালাই। আহ!!
মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালি গ্রামের বাসিন্দা গোপালদা এখনও আইসক্রিম বিক্রি করেন। তবে তার পেটরার আইসক্রিম সাধে-গুনে এখন আগের চেয়ে অধিক উন্নত হয়েছে। দামও বেড়েছে অধিক। কিন্তু গোপালদার নিজের মানের কোন উন্নতি হয়নি। এখনো তিনি সেই ফেরি করেই বেড়ান স্কুল থেকে স্কুলে।
সাদাসাদি মানুষ গোপালদা। শহরের শিশু বিদ্যালয় গুলোর শিক্ষার্থীদের কাছে যিনি অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই যিনি কাটিয়ে দিলেন ওইসব স্কুলের আনাচে কানাচে। ঘন্টা বাজিয়ে। আইসক্রিম! এই আইসক্রিম!
মাগুরার সব শ্রেণীর কাছে সমাদৃত গোপালদা সেই কৈশর বয়সেই যে ভারি বাক্স কাধে তুলে নিয়েছিলেন সেটি বইতে বইতে এখন তিনি খুবই ক্লান্ত। তবু এখনও টানতে হয় সংসারের বোঝা। জীবিকার প্রয়োজনে এখনও আইসক্রিম আবার কখনোবা ভিন্ন কিছু ফেরি করে বেড়ান এখানে সেখানে। রুটি রুজির প্রয়োজন প্রতিদিনই যাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। জীবনের একটি দিনও যাকে অলসতা বেধে রাখতে পারেনি ঘরের চৌকাঠে সেই ফেরিওয়ালা সকলের গোপালদা।
দীর্ঘদেহি গোপালদা জানান, বিদ্যালয়ের শিশুরা তার খুবই প্রিয়। যাদের কাছে আইসক্রিম বিক্রির লাভের এক পয়সা, দু পয়সা দিয়েই সন্তানদের বড় করেছেন। তিনটি মেয়েকে বিয়ে দিতে পেরেছেন তাদের কল্যাণেই।
তিনি বলেন, একেকটি শিশু যখন খুব আনন্দ নিয়ে আইসক্রিম খায় তাদের চোখে মুখে খুশি খেলে যায়। যা দেখে মনটিও আনন্দে ভরে ওঠে। যেন প্রশান্তি নেমে আসে।
মাগুরা শহরের তিন নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে দাড়িয়ে আইসক্রিম বিক্রি করতে করতেই তিনি জানালেন আরো অনেক কথা। তিনি বললেন, অনেকবার সুযোগ হয়েছে, আবার আত্মীয় স্বজনদের কেউ কেউ বলেছে, আইসক্রিম বিক্রি কঠিন কাজ। এটি ছেড়ে দেয়া ভাল। কিন্তু পারিনি। ছোট ছোট শিশুদের দেখলে মন কেমন ভাল হয়ে যায়। তাইতো সেই বিশ বছর বয়সে যা শুরু করেছিলাম। তা এখনো করে যাচ্ছি। আর কটা দিন, ঠিক চলে যাবে।
শিশুদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকেই গোপালদা এ সময় তার মনের ভিতর লুকিয়ে রাখা নিজের স্বপ্নটির কথাও জানালেন। একটি দোকান হবে তার। চার চাকায় চলবে সেটি। যেটি তার স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নটি অনেকদিন ধরেই তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি ভাবেন, একদিন তার সেই স্বপ্ন ঠিক পূরণ হবে।
স্বপ্নের কথাগুলো বলবার সময় চোখদুটি যেন হাসিতে ভরে উঠলো গোপালদার। ঝিলিক দিয়ে উঠলো ছলছল কোনগুলো। জানালেন, একটি ভ্যানগাড়ি। অনেক রঙে, ফুল পাখিতে ভরে থাকবে গাড়িটি। মাথার উপর থাকবে ছাউনি। তাও রঙিন। আর চারপাশ থাকবে ফ্রেমে বাধাই করা। শিশুদের উপযোগী নানা রকমের খাবার নিয়ে যাবেন স্কুলে স্কুলে। আর বেশি কিছুই নয়।
এমন সাদাসিদা যার চাওয়া তার প্রতিও ভালবাসা রয়েছে অন্যদের। বিশেষত অনেক দূরের পথে যারা বাস করেন সেইসব মানুষদের কাছে শৈশবের গোপালদা একটি সুখস্মৃতি হয়ে আছে। যার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে বিভিন্ন ভাবেই।
সম্প্রতি গোপালদার স্বপ্ন পূরণে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, ওয়েবসাইট, ফেসবুকের সদস্যরা। ইতোমধ্যে তারা “প্রিয় ফেরিওয়ালা আমাদের গোপালদা” নামে ফেসবুকে একটি গ্রæপ তৈরি করেছেন। যেখানে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভালবাসার মানুষেরা তার স্বপ্ন পূরণে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন অপেক্ষা সেই স্বপ্ন পূরণের দিনক্ষণটির জন্য…………….
অনেক ভালবাসার মানুষের সমন্বয়ে গোপালদার স্বপ্নের গাড়ি তৈরি হবে। পূরণ হবে তার দীর্ঘদিনের বয়ে বেড়ানো স্বপ্নটি সেই প্রত্যাশা সকলের।

-আবু বাসার আখন্দ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com