প্রথম পাতা » সংবাদ প্রতিদিন » অবৈধভাবে সমুদ্রে পথে বিদেশ যাত্রা ইমরান ও শাহিনবর্ণনা করলো নিষ্ঠুর নির্মমতার কাহিনী

অবৈধভাবে সমুদ্রে পথে বিদেশ যাত্রা ইমরান ও শাহিনবর্ণনা করলো নিষ্ঠুর নির্মমতার কাহিনী

অবৈধভাবে সমুদ্রে পথে বিদেশ যাত্রা ইমরান ও শাহিনবর্ণনা করলো নিষ্ঠুর নির্মমতার কাহিনী

প্রতিদিন ডেস্ক (অলোক বোস): পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়াগামী মাগুরা সদরের ডেফুলিয়া গ্রামের দুই যুবক প্রায় ৪ মাস পর দেশে ফিরে এসেছে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা ওই দুই যুবক মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ি ফিরে পুলিশ এবং আদালতের কাছে তুলে ধরেন পাচারকারীদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক ও তাদের উপর চালানো নানা নিষ্ঠুরতার কথা। একইভাবে তারা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন দিনের পর দিন অনাহার-অর্ধাহারের ভিতর দিয়েও তাদের উপর চালানো অত্যাচার-নির্যাতনের করুন কাহিনী।

পাচারকারীদের কবল থেকে ফিরে আসা ওই দু’যুবক হচ্ছে সদর উপজেলার ডেফুলিয়া গ্রামের মফিজার শেখের পুত্র ইমরান শেখ (২৩) ও নূর ইসলামের পুত্র শাহিন মোল্লা (২২) ।
ইমরান ও শাহিন জানায়, নিজ গ্রামের রবিউল ও কামরুলের মাধ্যমে পরিচয়ের সুত্র ধরে ঝিনাইদহের হাটগোপালপুর এলাকার রাজ্জাক নামে এক দালালের মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য তারা আড়াই লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তিবদ্ধ হয়।
তারা জানায়, জাহাজের ভিআইপি ক্যাবিনে চড়ে ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে সমুদ্র পথে তারা মালয়েশিয়ায় পৌছাবে। জাহাজে যাত্রাকালিন সময় তাদের পরিবেশন করা হবে পছন্দ অনুযায়ি উন্নতমানের খাবার। এরপর মালয়েশিয়া পৌছলে থাকা খাওয়া বাদেই প্রতিমাসের জন্য অপেক্ষা করছে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি। যে প্রলোভনে তারা সংকল্প করে বিদেশ যাত্রার। যার ধারাবাহিকতায় ১২ জুন রাতে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা করে নিয়ে তাদের ঢাকার সায়েদাবাদে নিয়ে রফিক নামে এক দালালের হাতে তুলে দেয়া হয়। রফিক নামে এক দালাল ওই রাতেই অন্যদের সহায়তায় তাদের তুলে দেয় কক্সবাজারের গাড়ীতে। পরদিন সেখানে পৌছবার পর আরো কয়েকজনের সঙ্গে তাদের একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়। যারা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে দেশের মাটি ছাড়ার সংকল্প করেছিল সেখানে তাদের প্রতি এমন আচরণ, এমন বেহাল দশা দেখে হত বিহবল হয়ে পড়ে ইমরান ও শাহিন। এমন অবস্থায় তারা বিদেশ যাবে না বলে জানালে পাচারকারীরা তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গালি দিয়ে বলে তোদের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখানে আসলে আর ফিরে যাওয়া যায় না বলে তারা তাদের শাসিয়ে যায়।
এ ঘটনার পর ১৪ জুন তাদের ভিতর থেকে ৮ কিংবা ১০ জনকে একটি ট্রলারে তোলা হয়। সমুদ্র পথে ট্রলার দেড় দিন চলার পর গভীর সমুদ্রে নিয়ে তাদের একটি কার্গো জাহাজে তোলা হয়। যেখানে আগেই অন্তত ২শ মানুষ অবস্থান করছিল। দিনের পর দিন জাহাজটি সেখানে রাখার পর প্রায় সাড়ে ৪০০ লোক ভর্তি হলে ২ এপ্রিল জাহাজটি থাইল্যান্ডের উদেশ্যে রওনা হয়। মাঝপথে বার্মা থেকে নারী-পুরুষ, শিশুসহ আরো ৪০০ জনকে জাহাজে তোলা হয় বলে রাজ্জাক জানায়।
তারা আরো জানায়, সমুদ্রে পথে জাহাজটি থাইল্যান্ডে ঢুকতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা আরো অনেক দিন সমুদ্রেই ভাসছিল। গড়ে তিন মাসের অধিক সময় সমুদ্রের মধ্যে জাহাজে অবস্থানকালে পাচাকারীরা তাদের উপর অমানুসিক অত্যাচার নির্যাতন চালাতে থাকে। ২৪ ঘন্টায় মাত্র একবার আধা প্লেট ভাত, একটি শুকনা মরিচ ও এক কাপ পরিমাণ পানি তাদের দেয়া হতো। এর ভিতর কেউ ভাত বা পানি চাইলে তাদের কিল, ঘুষি, লাথি মারা হত। লাঠি ও চাবুক দিয়ে পেটানো হতো। মাথায় জুটতো পিস্তলের বাটের আঘাত। এ ছাড়া মাঝে মাঝেই আতঙ্কিত করে তুলতে কোন কারণ ছাড়াই সবাইকে পেটানো হত। একদিন অতিরিক্ত পানি চাওয়ার অপরাধে নরসিংদীর এক জনকে পিটিয়ে এবং লোহার পিলারে মাথা ঠুকে হত্যার পর সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়। এভাবে ওই যাত্রায় তাদের চোখের সামনেই তারা নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে ৪ জনকে হত্যা করা। সে যাত্রায় পায়খানা প্র¯্রাব করার কোন সুযোগ ছিল না। জাহাজের খোলে শতশত মানুষকে গাদাগাদি করে বসিয়ে রাখা হত বলে তারা জানায়।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সাগরের পানিতে ভেসে চলা জাহাজের তেল ফুরিয়ে আসলেও তারা থাইল্যান্ডে ঢুকতে ব্যর্থ হয়। একই সাথে জাহাজের খাবার ও পানি শেষ হয়ে গেলে মে মাসের শেষ অথবা জুন মাসের প্রথম দিকে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাদের ফেলে অন্য একটি জাহাজে উঠে চলে যায়। এমনকি যাওয়ার সময় তারা জাহাজের ফ্যান, লাইট, রান্নার চুলা নষ্ঠ করে রেখে যায়। এভাবে ভাসমান জাহাজে তিনদিন ধরে অনাহারে থাকার পর একটি মাছ শিকারকারী ট্রলার সেখানে উপস্থিত হবার পর ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারি দেখে তাদের দুই বস্তা চাল ও জাহাজের জালানী হিসেবে ৪০ লিটার তেল সরবরাহ করে। কিন্তু সেখানে রান্নার কোন ব্যবস্থা না থাকায় তিন দিন ধরে অভুক্ত থাকা মানুষেরা শুধু চাল চিবিয়েই জীবন রক্ষা করে। পরে ওই জেলেদের কাছ থেকে খবর পেয়ে বার্মা নৌ-বাহিনীর সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে বিদেশী মানবাধিকার সংস্থার কাছে তুলে দেয়। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে খবর পাঠানো হলেও তার কোন খোজ খবর নেয়নি বলে সে জানায়। সে সময় তারা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তি এলাকায় কোন ক্যাম্পে অবস্থান করছিল বলে তাদের মনে হয়। কিন্তু তারপরও তারা সেখান থেকে দেশে ফিরতে পারছিল না। এ অবস্থায় তারা দু’জন ও সিরাজগঞ্জের ৩ জন মোট ৫ জন ক্যাম্প থেকে পালাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এক পর্যায়ে তারা সপ্তাহ খানেক আগে কাটা তারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে ক্যাম্প থেকে পালাতে সক্ষম হয়। পরে তিনদিন তিনরাত রোদে-বৃষ্টিতে বিভিন্ন পাহাড়ে লুকিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাকি দিয়ে মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে এক মুসলিম পরিবারের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। এসময় তাদের সব ঘটনা বুঝিয়ে বলার পর তারা মায়ানমারের সীমান্ত পার করে বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে টেকনাফ পৌছে দেয়। পরে সেখান থেকে মঙ্গলবার বাড়ি ফিরে আসা।
মৃত্যুর দুয়ার থেকে পরিবারের কাছে ফিরে আসার পর ইমরান ও শাহিন তাদের উপর চালানো অত্যাচার নির্যাতনকে দোযকের আজাব হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশের মাটিতে কমলা খাটলে অবৈধ পথে বিদেশ না যাবার আকুতি জানিয়েছে তারা। একই সাথে এখনো যারা সমুদ্রের আরো অনেক জাহাজে মানবেতর জীবন যাপনকারী বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার জন্য তারা সরকারের প্রতি আকুতি জানিয়েছে।
এদিকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা দু’যুবকের মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা তাদের ফিরে পেয়ে খুশি।  ইমরানের মা হাসিনা বেগম জানান, ইমরানের খোজে দ্বারে-দ্বারে ঘুরেছি। দীর্ঘ দিনেও ছেলের কোন খোজ না পেয়ে ভেবেছিলাম দুনিয়াতে হয়তো নেই। কিন্তু আল্লাহ আমার সন্তান ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার একেএম এহসান উল্লাহ জানান, ইমরান ও শাহিনকে অবৈধভাবে বিদেশ পাচারের অভিযোগে ইমরানের ভাই রাজু শেখ মাগুরা সদর থানায় মানব পাচারের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ মামলার ২ আসামী রবিউল ওরফে রানা ও কামরুলকে মঙ্গলবার গ্রেফতার করেছে। এছাড়া প্রধান আসামী রাজ্জাককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অবিলম্বে গোটা চক্রকে সনাক্তের পর তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com