প্রথম পাতা » মুক্তিযুদ্ধ » শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লুতু: একটি রক্তাক্ত অনুসন্ধান

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লুতু: একটি রক্তাক্ত অনুসন্ধান

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লুতু: একটি রক্তাক্ত অনুসন্ধান

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লুতু। পুরো নাম লুৎফর রহমান লুতু। সাহসী-সংগ্রামী বিপ্লবী এক নাম। যিনি মনেপ্রাণে শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। এই নামটি আমাদের হ্নদয়কে বড় বেশি আন্দোলিত করে, আলোড়িত করে। লুতু নামটি মিশে আছে নবগঙ্গার ঢেউয়ে-শ্রোতে গোধুলী বেলার নিরবতায় এবং পারনান্দুয়ালী গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণার সাথে।
একাত্তরের উত্তাল দিনে নির্মম নৃশংসভাবে হত্যা করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। জুলাই মাসের এক সকালে সবার মাঝে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। তারপর আর কোনোদিন ফিরে আসেনি লুতু। ঐদিন রাতেই লুতুকে নির্মমভাবে হত্যা করে নবগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেই কঠিন দুঃসহ স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেনি লুতুর পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সহযোদ্ধা শুভাকঙ্খিরা। তবে মৃত্যুকে বরণ করে লুতু রেখে গেছেন দেশপ্রেমের এক মহান দৃষ্টান্ত। বাঙালি জাতির রক্ত ভেজা স্বাধীনতায় লুতুর আত্মত্যাগ উজ্জ্বল দৃষ্টান্তই বটে।
একাত্তরের ১৯ জুলাই। তখনও সূর্য উঠেনি। ফজরের নামাজ আদায় করে পারনান্দুয়ালীর ভীতসন্ত্রস্থ মুক্তিকামী মানুষগুলো ঘরে ফিরছে। চারিদিকে কিচিরমিচির করছে পাখপাখালি। ঠিক তখনই স্বজনদের একেবারে বুকের মধ্য থেকে ঘাতকরা তুলে নিয়ে গেল মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান লুতুকে। লুতুকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার সময় সশস্ত্র ঘাতক রাজাকারের দল মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলল খুব শীঘ্রই লুতুকে ওরা ফেরত দিয়ে যাবে। কিন্তু ঘাতকরা আর কোনোদিন লুতুকে ফেরত দিয়ে যায়নি। সেই থেকে লুতুর মা, পরিবার-পরিজন দিনের পর দিন অপেক্ষা করলেও লুতুর ফিরে আসাতো দূরে থাক তাকে কোথায় হত্যা করা হয়েছিল সেই চিহ্নেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
লুতুর বাবার নাম মুন্সী ইয়াদ আলী আর মায়ের নাম জোবাইদা খাতুন। বাড়ি মাগুরা জেলার সদর থানার পারনান্দুয়ালী গ্রামের ব্যাপারী পাড়াতে। নবগঙ্গার একেবারে পাড় দিয়ে এই গ্রাম। লুতুদের বাড়িও নবগঙ্গার পাড়ে। আষাঢ়-ভাদ্র মাসে নবগঙ্গার পানি লুতুদের বসত বাড়ি চুমু দিয়ে যায়। ভাইবোনের মধ্যে লুতু সবার ছোট। স্বভাবতই পরিবারে সে সবার প্রিয়ও বটে। রাজনীতি সচেতন টগবগে তরুণ লুৎফর রহমান লুতু মাগুরা থানা পূর্ব পাকিস্তাান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর সাধারণ সম্পাদক। একই সাথে মাগুরা কলেজে বি.কম ক্লাসের ছাত্র। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী লুতু সাম্যবাদী শোষণহীন সমাজে বিশ্বাসী। কৃতি ফুটবলার হিসেবেও তার সুখ্যাতি সর্বত্র। ফরোয়ার্ড পজিশনের দুর্দান্ত ফুটবলার। মুগ্ধ চোখে সবাই তাঁর খেলা দেখেন। বিভিন্ন জায়গাতে ফুটবল খেলতে যান।
মার্চে মুক্তিযুদ্ধ যুদ্ধ শুরু হলে শত্রæর মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সমগ্র মাগুরা মুক্তিকামী মানুষেরা। মাগুরা সদর থানাসহ শ্রীপুর, মোহাম্মদপুর, শালিখা সব থানাতেই মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে গোটা মহকুমাতে। যে যার অবস্থান থেকে শক্র প্রতিরোধে সংগঠিত হতে থাকে। লুতু এবং তার রাজনৈতিক সতীর্থরা মাগুরাতে পাকবাহিনী এবং রাজাকার আলবদর আলশামস চক্রের হাত থেকে জানমাল রক্ষার প্রতিরোধে নামেন। রাজাকারদের রোষানল থেকে মানুষকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু মাগুরার রাজাকার আলবদর বাহিনী শুরুতেই কমিউনিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসীদের খতম করতে পাক হানাদারদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুতে থাকে। রাতের আঁধারে শহর এবং শহরবর্তী বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় অপারেশন চালিয়ে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাকে অপহরণ করে নির্যাতন ও হত্যা শুরু করে। রাজাকারদের টার্গেটে পরিণত হন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা লুতুও। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই ভোর রাতে লুতুকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকার আলবদর-আল শামস চক্র। তারপর টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করে লুতুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
লুতুর বন্ধু, রাজনৈতিক সহকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই লুতু এবং তার সহযোগীরা বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অভিপ্রায়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ার আমবাগানে লুতু তার রাজনৈতিক বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে ড্যামি রাইফেল সংগ্রহ করে ট্রেনিং শুরু করেন। এদিকে মুহূতেই মাগুরা থানা সদর এবং আশেপাশে কুখ্যাত রাজাকার রিজু এবং কবীরের নেতৃত্বে রাজাকার আলবদর চক্রের কিলারগ্রæপ-এর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের খতম করতে তৎপর হয়ে উঠে। এসময় নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবেই লুতু নিজ বাড়িতে থাকতেন না। এখানে ওখানে আত্মগোপন করে থাকতেন। তবে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করতেন নিজ গ্রামের একই পাড়াতে বড় বোনের মেয়ে টুকুর বাড়িকেই। ওখানে এসেই আশ্রয় নিতেন রাতে। ১৯ জুলাই ঘটনার আগের রাতেও লুতু এসে আশ্রয় নেন ভাগ্নি সুরাইয়া হোসেন টুকুর বাড়িতে। ওখানে আরেক মুক্তিযোদ্ধা শ্রীপুরের সারঙ্গদিয়া গ্রামের মাহবুবুর রহমান বাবু এবং মু্িক্তযোদ্ধা লুতু রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রাজাকার আলবদর চক্রের নিয়োগকৃত গোয়েন্দারা লুতুর অবস্থান নিশ্চিত করে খবর পৌছে দেয় পাকবাহিনী এবং রাজাকারদের কাছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, ১৯ জুলাই ভোর হওয়ার আগেই সশস্ত্র রাজাকার আলবদর চক্রদের একটি দল তাদের নিয়োগকৃত গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লুতুর ভাগ্নি টুকুর বাড়ি ঘেরাও করে। এসময় বাড়িতে দু একজন প্রবীণ ছাড়া পুরুষ লোক ছিলো না বললেই চলে। যারা ছিল তারাও সশস্ত্র রাজাকারদের সামনে আসা থেকে বিরত থাকেন নিরাপত্তার স্বার্থেই। টুকুসহ বাড়ির নারী সদস্যরা দরজা খুলে বের হয়ে এলে মুখোশধারী সশস্ত্র রাজাকাররা প্রথমেই বলে ‘এখানে মুক্তিযোদ্ধা লুতু লুকিয়ে আছে ওকে বের করে দিতে হবে। ওকে আমরা নিতে এসেছি। লুতুকে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া না হলে কেউ রক্ষা পাবে না’।
রাজাকারদের এরকম কথা এবং অনবরত হুমকি ধামকি শুনে প্রথমে সবাই হতচকিত হয়ে উঠেন। এখানে লুতু নেই বলে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করলেও রাজাকাররা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে বাড়ির মা-বোনেরা হেরে যায় সশস্ত্র রাজাকারদের হুমকির কাছে। এদিকে বাড়ির সবার কথা চিন্তা করে নিজেই ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন মুক্তিযোদ্ধা লুতু। সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র মুখোশধারী রাজাকাররা তাকে ঘিরে ফেলে। একজন রাজাকার পাশেই কুয়া থেকে পানি তোলার বালতির হাতলের দড়ি খুলে নিয়ে আসে। সেই দড়ি দিয়ে সবার সামনেই লুতুকে পিঠ মোড়া করে বাঁধা হয়। তারপর তার দুচোখও বাধা হয়। লুতুর আপনভাগ্নি টুকু, তাঁর শাশুড়ি এবং অন্যান্যরা তাদের প্রিয় লুতুকে না নেওয়ার জন্যে অনুনয় বিনয় করতে থাকেন। কিন্তু শত অনুনয় বিনয় উপেক্ষা করে লুতুকে আত্মীয় স্বজনদের চোখের সামনেই তাদের বুকের মাঝ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজকার আলবদর চক্র যাওয়ার সময় ফের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলে লুতুকে দ্রুতই তারা ফেরত দিয়ে যাবে।
মুহুর্তেই এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা গ্রামে। লুতুর আত্মীয়স্বজনরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় লুতুকে খুঁজতে থাকেন। লুতুকে ফেরত পাবার আসায় লুতুর আত্মীয়স্বজন লোক মারফত রাজাকারদের সাথে যোগাযোগ করলেও কোনো লাভ হয়নি। লুতুর নিকটাত্মীয় হাজী আবু বক্কার মিয়া (যিনি ‘বড়লোক বক্কার’ বলে পরিচিত) আপ্রাণ চেষ্টা করেন লুতুকে ফিরিয়ে আনতে। রাজাকারদের সাথে দূত মারফত গোপনে যোগাযোগ করে তিনি এমন প্রস্তাবও দেন সম ওজনের টাকা দিয়ে লুতুর প্রাণভিক্ষা চান। কিন্তু সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে যায় ঘাতক রাজাকারদের কাছে।
ধারণা করা হয় লুতুকে গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের পিটিআই-এ অবস্থিত পাকবাহিনীর টর্চার সেলে। ওখানেই লুুতুকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। তারপর তাকে হত্যা করে নবগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ্য ঐ একই দিনে শহরের আরেক মুক্তিযোদ্ধা তাঁতী পাড়ার কবীরকেও অপহরণ করে নিমর্মভাবে হত্যা করে রাজাকার আলবদর চক্র।
শহীদ লুতুর আপন ভাগ্নি টুকু তার প্রিয় ছোট মামার অপহরণের সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষদর্শী। প্রিয় ছোট মামাকে তার সামনে থেকে নিয়ে যাওয়ার সেই দুঃসহ স্মৃতি তিনি হ্নদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। বরং মামার কথা মনে পড়লেই তিনি কেঁদে উঠেন। নীরবে আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছেন। সুরাইয়া বেগম টুকু সেই দিনের কথা স্মরণে এনে বলেন, তখন তিনি দু সন্তানের জননী। কোলের ছোট ছেলে মুরাদের বয়স মাত্র চার মাস। তাঁর স্বামী তখন খুলনার মংলা টিএন্ডটি অফিসে চাকরি করতেন বলে বাড়িতে তিনি দুটো শিশু সন্তান নিয়ে একাই থাকতেন। সুরাইয়া বেগম টুকু বলেন, তাদের শোবার ঘরের পেছনে ছিল চ্যাগারের বেড়ার ছোট্ট একটা টিনের ঘর। ওখানেই তার ছোট মামা আত্মগোপন করে থাকতেন। তার মামা যে এ বাড়িতে এসে রাতে থাকতেন এই বিষয়টি কেউই জানতো না, নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি গোপনই রাখা হতো। ঘটনার রাতে তার মামা এবং অপর মুক্তিযোদ্ধা তার স্বামীর আপন ভাগ্নে মাহবুবুর রহমান বাবু (বর্তমানে জার্মান প্রবাসী) এ দুজন একসাথে থাকলেও রাজাকাররা সনাক্ত করতে না পারার কারণে মুক্তিযোদ্ধা বাবু নিজেকে কোনোমতে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
লুতুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগ মুহুর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ভোরবেলা প্রথমে সশস্ত্র মুখোশধারী রাজাকাররা পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তারা সংখ্যায় ছিল বেশ কয়েকজন। মুখে কালো কাপড় বাঁধা থাকায় কাউকে চেনার উপায় ছিল না। রাজাকাররা পুরো বাড়ি ঘেরাও করলে তিনিসহ বাড়ির অন্যান্য মা-খালারা ঘুম থেকে উঠে এসে রাজাকারদের মুখোমুখি হন। শুরুতেই রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা লুতুকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার জন্যে হুংকার দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা এও বলে লুতুকে বের করে না দিলে তাদের সবাইকে হত্যা করবে। এরকমই এক পর্যায়ে তার মামা ঘর থেকে নিজেই বেরিয়ে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজাকাররা কুয়ার দড়ি দিয়ে লুতুকে বেঁধে তাদের চোখের সামনেই নিয়ে চলে যায়।
সুরাইয়া বেগম টুকুর বিশ্বাস খুব কাছের একটি চক্র অনেক আগে থেকেই অনুসরণ করে নিশ্চিত করে যে মুক্তিযোদ্ধা লুতু তার বাড়িতেই আছে এবং সেই পরিকল্পনামতেই তার মামাকে অপহরণ করে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ লুতুর কোনো খোঁজ মেলেনি। পাওয়া যায়নি তার লাশ অথবা কোনো স্মৃতিচিহ্ন। আর এ কারণেই শহীদ লুতুর মা যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন চোখের পানি ফেলেছেন শুধু ছেলের শেষ চিহ্নটুক খুঁজে পাওয়ার আশায়। কিন্তু সে আশা পূরণ হওয়ার আগেই ছেলের শোকে একসময় তিনিও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং লুতুর সহযোদ্ধাদের মতে, মাগুরার রিজু-কবীর রাজাকার চক্রই লুতুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। যারা পরবর্তীতে শহরের আরেক মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুন্নাহার হেলেনাকেও হত্যা করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
মাগুরা শহরে এবং আশেপাশে লুতুর ছিল অসংখ্য রাজনৈতিক বন্ধু, সহকর্মী ও সহযোদ্ধা। এদের মধ্যে উল্লে¬খযোগ্যরা হলেন- কলেজ পাড়ার বজলুর করিম রাকু, ভায়নার আবু বকর সিদ্দিকী ( কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন), খান মনোয়ার হোসেন রেন্টু, অংকনশিল্পী তোতা, কুকনোর সাংবাদিক Freedom-fighter-lutuমোস্তফা মাজেদ। তাদেরই একজন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন পন্থী) শীর্ষনেতা  ভায়নার আবু বকর সিদ্দিকী, যিনি লুতুর অত্যন্ত ঘনিষ্ট একজন রাজনৈতিক বন্ধু ছিলেন। আজো  তার হ্নদয় থেকে একবিন্দুও মুছে যায়নি লুতুর স্মৃতি। লুতু প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, লুতু ছিলেন মেধাবী এক ছাত্রনেতা এবং প্রচন্ডরকম বন্ধুবাৎসল। তার ব্যক্তিগত শত্রæ থাকতে পারে এটি কখনই বিশ্বাস করতাম না। অথচ তার মতো একজন ছাত্র নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে রাজাকার রিজু-কবীর চক্র। সেই সময়ের স্মৃতি স্মরণে এনে তিনি বলেছিলেন, ‘চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে একসময় আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন পন্থী) কর্মীরা সিদ্ধান্ত নেই মাগুরা ছেড়ে ভারতে চলে যাব। লুতুর সাথে আমাদের যোগাযোগও হয়। কিন্তু ভারতে যাওয়ার আগেই ঘাতকরা লুতুকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।’
লুুতুর আরেক সহযোদ্ধা সাংবাদিক মোস্তফা মাজেদ। গ্রামের বাড়ি মাগুরার কুকনোতে। বর্তমানে ঝিনেদা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। একাত্তরে মাগুরা থানা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের যে কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শহীদ লুতু সেই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মোস্তফা মাজেদ। শহীদ লুতুর সাথে বন্ধু মাজেদের সর্বশেষ দেখা হয়েছিল লুতুর মৃত্যুর কিছুদিন আগে। ভারতে বসে মোস্তফা মাজেদ এবং তার অন্য বন্ধুরা খবর পান তাদেরই বন্ধু লুতুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। মোস্তফা মাজেদ জানান, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সহ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বেশিরভাগ কর্মী আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। এমতাবস্থায় নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে রাজনৈতিক কর্মীরা মিলে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতে যাওয়ার আগে একদিন তিনি বন্ধু লুতুর বাড়িতে আসেন এবং লুতুকে বলেন ভারতে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু লুতু তখন স্পষ্টত জানিয়ে দেন তিনি ভারতে যাবেন না। উল্টো র‌্যাক থেকে কয়েকটি বিপ্লবী বই ও পুস্তিকা বের করে তার সামনে মেলে ধরে মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে পরিণত করে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলেন।
মোস্তফা মাজেদ আরো জানান, তিনি যখন ভারতে যাওয়ার চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঠিক করেন তখন আবারো ভারতে যাওয়ার আহবান জানিয়ে লোক মারফত চিরকুট পাঠান লুতুর কাছে। কিন্তু লুতু আসেনি। মোস্তফা মাজেদের মতে, লুতু আপাদমস্তক যেমন একজন বিপ¬বী ছিলেন তেমনি ছিলেন বন্ধু প্রিয়। এ কারণে লুতুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ওকে কেউ হত্যা করতে সাহসী হবে না। কিন্তু রাজাকার আলবদর চক্র সেই বিশ্বাসেই আঘাত করে লুতুকে নিষ্ঠুর নির্মমভাবে হত্যা করে।
লুতুর সাথে একই বিছানায় শুয়েছিলেন আরেক শ্রীপুরের সারঙ্গদিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবু। কিছুদিন আগে জার্মান থেকে তিনি দেশে এ বিষয়ে কথা হয় তাঁর সাথে। মাহবুবুর রহমান বাবু বলেন, দুজনে এক সাথে শুয়েছিলাম। আমাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। ভোরে সশস্ত্র রাজাকাররা লুতু ভাইকে টার্গেট করে পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলে। চ্যাগারের বেড়া দিয়ে আমরা সব দেখতে পাই। বুঝতে পারি মৃত্যু অণিবার্য। হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। লুতু ভাই সিদ্ধান্ত নেন তিনি পালাবেন না। আত্মসমর্পণ করবেন। আমাকে সে কথাই বললেন। করলেনও তাই। হুড়কো তুলে ঘরের দরজা খুলে দিলেন। ব্যাস খুনীরা বেধে ফেলল লুতু ভাইকে। আমাকে চিনতে না পারায় আমি কৌশলে বের হয়ে এলাম। তারপর কুমার নদের তীর ধরে কয়েকঘন্টা হেঁটে নিজ গ্রাম সারঙ্গদিয়াতে ফিরি। মাহবুবুর রহমান বাবু বলেন, জীবন মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণের কথা মনে পড়লে তিনি ভীষণ আবেগী হয়ে পড়েন।
অনসন্ধানে জানা যায়, সাহসী ছাত্রনেতা লুতু হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন মাগুরার কুখ্যাত রাজাকার রিজু-কবীর চক্র। এ দুজনের পরিকল্পনা মোতাবেক একদল রাজাকার লুতুকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। যুদ্ধ শেষ হলে অনেকর মতো শঞীদ লুতুর মাও অপেক্ষায় ছিলেন হয়ত একদিন তাঁর প্রিয় সন্তান ফিরে আসবে। কিন্তু কোনোদিন আর লুতু ফিরে আসেনি। লুতুর শোকে মা জোবাইদা খাতুন পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতেন। কাঁদতে কাঁদতে চোখের কোনায় তাঁর ঘা পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন বলেই জীবন দিতে হয় লুতুকে। কিন্তু এই বীর সাহসী মুক্তিযোদ্ধার জন্যে আজ পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কিছুই করা হয়নি। স্থানীয়দের মতে, শহীদ লুতুসহ মাগুরার অপরাপর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে এমন কিছু করা হোক যাতে করে নতুন প্রজন্ম দেশের জন্যে এই বীরদের জীবন উৎসর্গ সম্পর্কে জানতে পারে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেটুকু করা হলেই তাদের প্রতি পরিবারের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা হবে।

শহীদ লুতুর পরিচয়
পুরো নাম: লুৎফর রহমান
ডাক নাম: লুতু
পিতার নাম: মরহুম ইয়াদ আলী মুন্সী
মাতার নাম: মরহুমা জোবাইদা খাতুন
বড় ভাই: খলিলুর রহমান
মেঝ ভাই: মরহুম শহীদুর রহমান
সেজো ভাই: হাবিবুর রহমান
বোন: রোকেয়া খাতুন
(পরিবারে শহীদ লুৎফর রহমান লুতু ছিলেন ছোট ছেলে)

জাহিদ রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com