প্রথম পাতা » খেলাধূলা » সৌম্য সরকার: ক্রিকেটের নতুন এক সৌন্দর্য

সৌম্য সরকার: ক্রিকেটের নতুন এক সৌন্দর্য

সৌম্য সরকার: ক্রিকেটের নতুন এক সৌন্দর্য

জাহিদ রহমান: প্রতিভাবন ব্যাটসম্যান সৌম্য সরকারকে আমাদের ক্রিকেটের নতুন সৌন্দর্য বললে একটুও ভুল হবে না। আত্মবিশ্বাস, ব্যাটিং স্টাইল দিয়ে তিনি সত্যিই তাঁর সৌন্দর্য উন্মোচন করে চলেছেন। আসলেই ক্রিকেটের নতুন সৌন্দর্য তিনি। নতুন সৌরভের এক ফুলবাগান। সাকিব, তামিম, মুশফিকের নামের পাশে তাঁর নামও তাই এখন উজ্জ্বলতরো। ক্যারিয়ারের বিচারে সাকিব, তামিম, মুশফিকদের তুলনায় তাঁর খেলা ম্যাচের সংখ্যা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়, কিন্তু শুধু সৌন্দর্যময় ব্যাটিং পারফরমেন্সের কারণেই সৌম্য এখন সবার মন জয় করে নিয়েছেন। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ এবং ক্রীড়ামোদীদের আলোচনায় তিনিও এখন অন্যতম। তাঁর পারফরমেন্স সবাইকে এতোটাই মুগ্ধ করেছে যে এমন এক তরুণের অপেক্ষাতেই যেনো ছিল সবাই। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে চলমান সিরিজে ১২ জুলাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৭৯ বলে ৮৮ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলে সৌম্য তাঁর ব্যাটিং সৌন্দর্যের আরেকটি প্রমাণ দিলেন। এই ইনিংসে ছিল ১৩ টি চার এবং একটি ছক্কার মার। স্ট্রাইক রেট ১১৩.৩। বলতে দ্বিধা নেই দেশের ক্রীড়ামোদীরা এদিন প্রাণ ভরে উপভোগ করে সৌম্য সরকারের দূরন্ত ব্যাটিং। স্বভাবতই ম্যান অফ দ্যা ম্যাচের স্বীকৃতিটুক আগেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল তাঁর জন্যে।
আন্তজাঁতিক ক্রিকেটে সৌম্য সরকারের আগমন খুব বেশি দিন নয়। মূলত এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটারের সময়ই সৌম্য নামটা খানিকটা আলোচনায় উঠে আসে। সেসময়ই তিনি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন তাঁর হাতের মধ্যে কিছুটা যাদু লুকিয়ে আছে। সময় সুযোগ পেলেই তিনি সেই যাদু উন্মোচনে সক্ষম হবেন। সত্যিই হাতের মাঝে লুকিয়ে থাকা সেই যাদু তিনি উন্মোচন করতে সক্ষম হন পাকিস্তানের সাথে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজ এবং চলমান দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। স্বল্প ক্যারিয়ারের এই তরুণ বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি একজন জাত ক্রিকেটার। তার মাঝে মাল-মশলার শেষ নেই। ব্যাটিং বিনোদন দিতেও তিনি পারঙ্গম। আগে থেকেই অবশ্য সৌম্য সেই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন-বড় কিছু করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু ভাগ্য সহায়তা না থাকার কারণে তার হাত থেকে সবকিছু ফসকে যাচ্ছিল। তবে পাকিস্তানের সাথে ওয়ানডে সিরিজের শেষ দিনে তাঁকে আর কেউ অবরুদ্ধ করে রাখতে পারেনি। ২২ এপ্রিল  তাই  সৌম্য হয়ে উঠেছিলেন অদম্য। সেদিন বাংলার মানুষ প্রাণভরে দেখেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে একজন বাঙালি তরুণের সাহসী ক্রিকেট। দেখেছে তার ব্যটিং সৌন্দর্য্য। সেদিন পাকিস্তানের সব কলাকৌশলকে পরাস্ত করে সৌম্য ১১০ বলে ১২৭ রানের এক ঝকঝকে অপরাজিত ইনিংস খেলে সবার মন ভরিয়ে দেন। রাতটাকে বড় বেশি আলোকিত করেন তিনি। এখানেই গল্প শেষ নয়। ১৩টি চার আর ছয় ছয়টা ছক্তা তার ইনিংসকে করে আরো উজ্জ্বলতরো। আবার স্ট্রাইক রেটটাও ছিল সবার থেকে বেশি ১১৫.৪৫। মজার ব্যাপার হলো ১২ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে চলমান সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও ফের ১৩ টি বাউন্ডারির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে অপরাজিত ৮৮ রান করেন। আরও একটি উচ্চকিত ইনিংস খেলার কৃতিত্ব দেখান তিনি।
সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন আমাদের ক্রিকেটে এই সময়ে এক অনন্য নাম সৌম্য। এই তরুণের পুরো নাম সৌম্য শান্ত সরকার। এই সময়ে যে সব উদিয়মান তারকা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন সৌম্য তাদের মাঝে অন্যতম একজন। এই অল্প অভিজ্ঞতাতেই মাঠে বিশ্বস্ততার ছাপ রেখে সবার মনোযোগ আকর্ষণ  করতে সক্ষম হয়েছেন। এতদিন ধরে যেসব ক্রীড়ামোদীদের চোখ ঘুরপাক খেত সাকিব, তামিম, মুশফিক বা মাশরাফিকে ঘিরেÑসেইসব চোখের নিশানাতে এখন সৌম্যও অনিবার্য। কদিন আগেই সৌম্য ছিলেন একেবারেই অজানা, অচেনা। কিন্তু সেই সৌম্যই এখন সবার চেনা। প্রিয়ও হয়ে উঠেছেন বেশ। আত্সবিশ্বাসী সৌম্য সাতক্ষীরার তরুণ। একেবারে গাঁওগ্রামের সন্তান। সাতক্ষীরাতেই বড় হয়েছেন। ক্রিকেটের হাতেখড়িও ওখানে। এরপর একসময় বিকেএসপিতে ভর্তি হন। বিকেএসপি থেকেই ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর অভিযেক।
জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাওয়ার আগেই সৌম্য ঘরোয়া ক্রিকেট নিজের পারফরমেন্স দিয়ে বুঝিয়ে দেন আগামী দিনে তাঁকে কেউ রুখতে পারবেনা। ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি খেলেন রাজশাহী বিভাগের হয়ে। প্রিমিয়ার ক্রিকেটে খেলেন ভিক্টোরিয়ার পক্ষে। গত বছরের জুনে কুয়ালালামপুরে অনূবর্ধ -১৯ এশিয়া কাপে কাতারের বিপক্ষে ডাবল  সেঞ্চুরি করে নিজ প্রতিভাকে উন্মোচিত করেন। ২০৯ রানের একটি বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছিলেন মাত্র ১৩৫ বলে। যাতে ছিল ২৭টি বাউন্ডারি ও আটটি ওভার বাউন্ডারি। সৌম্য এ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে খেলেছেন ৩২টি। ৬০টি ইনিংসে তাঁর রান ১৫৬৮। একদিনের ক্রিকেট তাঁর ডেবুও কিন্তু বেশি দিন নয়। গত বছরের পহেলা ডিসেম্বর। জিম্বাবুয়ে সফরে এলে পঞ্চম ম্যাচে তিনি খেলার সুযোগ পান। সে ম্যাচে ১৮ বলে দ্বিতী সর্বোচ্চ ২০ রান করেছিলেন সত্য, তবে চারটি চার মেরে নিজেকে খানিকটা রহস্যময় করে রেখেছিলেন। ছোট্ট ঐ ইনিংসে স্ট্রাইক রেট ছিল ১১১.১১। এরপর বিশ্বকাপ স্কোযাডে ডাক পান নিজের অবিশ্বাসকে পরাজিত করে। মধ্যখানে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে তাঁর ব্যাট থেকে উল্লেখযোগ্য রান এলে সৌম্য নির্বাচকদের নজরে পড়েন। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ঠাঁই হয় তাঁর। নবাগত হিসেবে বিশ্বকাপে তিনি ভালোই নিজেকে তুলে ধরেন। ১৩ মার্চ হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি আধা সেঞ্চুরির করার সাহস দেখান। তখন থেকেই তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ফিসফিস। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের  পাতায় তাঁকে নড়াচড়া শুরু করে ক্রিকেটমোদীরা।
সৌম্য শান্ত সরকার নিতান্তই আমাদের সাধারণ পরিবারের এক ধীর স্থীর সন্তান। দেখেই বুঝা যায়, আভিজাত্য কোনোদিনও তাঁর পরিবারে ছিল না। লড়াই-সংগ্রাম আর সাথে একমুঠো স্বপ্নকে ধরেই কেবল এগুতে হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক আভিজাত্য না থাকলেও ক্রিকেট আভিজাত্যের দিকে ছুটে চলেছেন এই তরুণ। ম্যাচ খেলছেন আর বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে উঠছেন। এই সময়ে কোচ চন্দ্রিকা হাতুরেসিংহের সবচেয়ে আস্থাভাজন তিনি। চন্দ্রিকা যেনো তাঁকে দিয়েই সবাইকে ঘায়েল করতে চান।
আসলে বাংলাদেশের মানুষ ঠিক কিছুদিন আগেই এভাবে ভাবেনি যে, আমাদের তরুণরা মাঠে নেমেই সাহস দেখাতে পারে। হাত খুলে পেটাতে পারে। প্রতিভাবন ক্রিকেটারদের কল্যাণে আমরা এখন সেটাই দেখছি। সত্যিই সময়ের সাথে সাথে আমাদের ক্রিকেট অনেক বদলে গেছে, অনেক এগিয়ে গেছে তা যে কেউ স্বীকার করবেন। সে প্রসঙ্গেই বলছিলেন সাবেক ক্রিকেটার দীপু রায় চৌধুরী। তাঁর মতে, আরও নতুন নতুস সৌম্য বেরিয়ে ্এলে দেশের ক্রিকেট আরও সমৃদ্ধ হবে। সৌম্যরাই এগিয়ে নিয়ে যাবে এদেশের ক্রিকেটকে। সৌম্যরাই এ দেশের ক্রিকেটকে করবে আরও সৌন্দর্যময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com