প্রথম পাতা » Featured » মহম্মদপুরের ডাঙ্গাপাড়া ধ্বংস স্তুপের জনপদ : আতঙ্কগ্রস্থ গ্রামবাসী

মহম্মদপুরের ডাঙ্গাপাড়া ধ্বংস স্তুপের জনপদ : আতঙ্কগ্রস্থ গ্রামবাসী

মহম্মদপুরের ডাঙ্গাপাড়া ধ্বংস স্তুপের জনপদ : আতঙ্কগ্রস্থ গ্রামবাসী

মহম্মদপুর সংবাদদাতা : মহম্মদপুর উপজেলার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধিন চার নেতার আধিপত্যের দ্বন্দ্বে মন্ডলগাতি ও রোনগর গ্রামে মধ্যকার ভয়াবহ সংঘর্ষের দুই দিন পার হলেও স্বাভাবিক হয়নি সেখানকার জীবনযাত্রা। ঘটনার জের ধরে নতুন করে প্রতিপক্ষের হামলা এবং পুলিশি ধরপাকড়ের ভয়ে গ্রামদুটি এখন পুরুষশূণ্য হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সংঘর্ষের আতঙ্কে দুটি গ্রামের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

বুধবারের দুই গ্রামের মধ্যে চলা সংঘর্ষ এবং পুলিশি টহলে পুরো এলাকায় চলছে অঘোষিত হরতাল। চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তুপ। পুলিশ ছাড়া সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নেই। বিধ্বস্ত দোকানপাটে নেই ক্রেতা-বিক্রেতা। সুনশান পরিবেশ সর্বত্র। পুলিশের টহল চলছে বিরতিহীন। বুধবার বিকেলে মন্ডলগাতী ও রোনগর গ্রামবাসীর মধ্যে দুই ঘণ্টাব্যাপী তান্ডবের পর থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সংঘর্ষের সময় ব্যবসা প্রতিষ্টানে হামলা ভাংচুর লুটপাট ও পেট্রল ঢেলে আগুন দেয় প্রতিপক্ষের লোকজন। এতে অন্তত ২০ টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংঘর্ষ, পুলিশের গুলি ও আগুনে দগ্ধ হয়ে আহত হন প্রায় ৫০ জন।

সরেজমিনে শুক্রবার সকালে গিয়ে দেখা গেছে, সংঘর্ষস্থল ডাঙ্গাপাড়া বাজারের চারদিকথেকে আসছে পোড়া গন্ধ। ছড়ানো ছিটানো ছাই কয়লার স্তুপ। আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেলেও তার ধ্বংস চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। তিলতিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আহাজারি করছেন। কেউ অসীম শূণ্যের দিকে তাকিয়ে আছেন। একদিন আগেও তাদের ছিল সাজানো ব্যাবসা। এখন সবখানে শুধুই কাঠ কয়লার স্তুপ। দেখলে মনে হবে বিদ্ধস্ত কোন জনপদ।

গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সংঘর্ষে জড়িত ম-লগাতি ও রোনগরসহ পাশের খলিশাখালী, পলাশবাড়ীয়া, মহিমানগর, মধুপুর, কালিশংকরপুর, যশোবন্তপুর, ডাঙ্গাপাড়াসহ অন্তত: ১০ গ্রামের পুরুষ মানুষ গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপন করেছেন। হামলা মামলার ভয়ে অধিকাংশ বাড়ি ছাড়া। বৃদ্ধ নারী শিশুরা বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। বাড়িতে কোন রান্নাবান্না হচ্ছে না। এক কাপড়ে অর্ধাহারে অনাহারে আছেন তারা। আতিœয় স্বজনদের পাঠানো খাবার খাচ্ছেন নারী শিশুরা। ক্ষেতখামার চাষবাস বন্ধ। গবাদি পশুগুলো রয়েছে অভূক্ত। অভিযুক্তদের আটকে বাড়িবাড়ি রাত-দিন তল্লাশী চালাচ্ছে পুলিশ ।

প্রতিপক্ষের লোকজন এ ঘটনার বদলা নিতে যে কোন সময় আবার হামলা চালাবে এমন গুজব সর্বত্র। অনেকে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্টান থেকে মূল্যবান মালপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী ও গবাদি পশু সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। গ্রাম দুটিতে সুনশান নিরবতা। রাস্তায় বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে সংঘর্ষে ব্যবহৃত ভাঙা ইটের স্তুপ। রাস্তায় তেমন লোকজন যানবাহন নেই। পুলিশের টহল গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। গ্রামের প্রবেশ পথে পুলিশকে অবস্থান নিয়ে থাকতে দেখা গেছে। এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে ।

বুধবার বিকেলে বিবাদমান দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষের সময় প্রকাশ্যে অগ্নিসংযোগে ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভষ্মীভূত হয়েছে। আরও অন্তত ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাংচুর লুট-পাট চালাানো হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িযে যাবে বলে ক্ষতিগ্রস্তরা জানান। জানা গেছে, পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ম-লগাতি ও রোনগর বড় দুইটি প্রতিবেশি গ্রাম। ডাঙ্গাপাড়া স্থানীয় হাট-বাজার হিসেবে পরিচিত। এই দুই গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আগ থেকেই বিরোধ ছিল।

১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে উপজেলার বনগ্রাম কিমস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রহমান ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জামালের মধ্যে স্কুলে হাতাহাতি হয়। তাদের বাড়ি উপজেলার পাশ্ববর্তি ম-লগাতি ও রোনগর গ্রামে। এ ঘটনায় দুই গ্রামের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। এই ঘটনায় মহম্মদপুর থানার ওসি আতিয়ার রহমান নিজে উপস্থিত উভয়পক্ষ ডেকে মঙ্গলবার মিমাংসা করেন। এরপরও দুই গ্রামবাসি ঘটনার বদলা নিতে প্রস্তুতি নিতে থাকে।

বুধবার নহাটা পুলিশ ফাড়ির এসআই জামাল ও লতিফ বনগ্রাম স্কুল মাঠে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সালিস বৈঠক বসান। সালিসে ম-লগাতি গ্রামের পক্ষে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা অলিয়ার রহমান, আব্দুর রহমান ও রোনগর গ্রামের পক্ষে নেতৃত্ব দেন একই রাজনৈতিক দলের জাফর মিয়া ও আসাদ মিয়া সালিসে পুলিশের উপস্থিতিতে চার নেতার সমর্থক মণ্ডলগাতি ও রোনগর গ্রামবাসীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দুই ঘন্টা স্থায়ী কাইজায় দেশী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের উপর হামলা চালান। হামলা, আগুনে পুড়ে ও পুলিশের গুলিতে উভয়পক্ষের কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন। আহতরা মাগুরা সদর হাসপাতাল, মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পাশ্ববর্তী নড়াইলের লোহাগড়া হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে ৬৫ রাউ- শটগানের গুলি নিক্ষেপ করে। পুলিশের গুলিতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। আগুনের মধ্যে দোকানে থাকা পেট্রলের ড্রাম বিষ্ফোরণে অন্তত ছয়জন দগ্ধ হয়ে গুরুতর জখম হয়েছেন। তাদেরকে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সংঘর্ষ চলাকালে রোনগর গ্রামবাসি মণ্ডলগাতির বাসিন্দা ডাঙ্গাপাড়া বাজারের ব্যবসায়িদের প্রতিষ্ঠানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এত ১০ টি মুদি তেল ধান পাটের গুদাম পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হামলা-ভাংচুর লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসব ব্যবসায়িদের মালপত্র লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন। মাগুরা থেকে দমকলের দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে। আগুন ভাংচুর ও লুটপাটে মুদি ঔষধ কাঠ ও ধান পাট ব্যবসায়িদের অন্তত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান। সংঘর্ষ চলাকালে ডাঙ্গাপাড়া বাজারে ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে ভাংচুর চালানো হয়।

বিবাদমান দুটি পক্ষই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হওযায় পুলিশ পড়েছে এখানে বেকায়দায়। তারা কারো বিরুদ্ধেই শক্ত অবস্থান নিতে পারছেন না বলে পুলিশের একটি সূত্র জানায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা না হলেও ১১জনকে আটক করেছে পুলিশ। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ও সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (সার্কেল) সুদর্শণ রায় বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছেন।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ম-লগাতি গ্রামের বাসিন্দা হারুনর রশীদ ম-ল বাদি হয়ে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে মহম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত আসামী রয়েছে আরও দুই শতাধিক। রোনগরের গ্রামের বৃদ্ধা সোনাই বড়ু বলেন, বিটারা বাড়ি থাকতি পারতেছে না। রাত্তিরি পুলিশি আসে দুয়োর গুতোচ্ছে। আমাগের বিটারা কাজের সুমায় মাঠে কামে ছিল। তাগেরো নিস্তার নেই।
ব্যবসায়ি বাশার মোল্যা আহাজারি করতে করতে বলেন, আমার তিনটি দোকান ঘর চোখের সামনে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিযেছে। সব ছাই হয়ে গেল।

ডা. আমিনুর রহমান বলেন, যাদের বিপদে আপদে রাত-দিন আমি ছুটে গেছি, বাকিতে ওষুধ দিয়েছি। তারাই আমার ঔষুধের দোকানে আগুন দিল। গণি মোল্লা বলেন, অনেক কষ্টে একটা দোকান দাড় করিয়েছিলাম। আগুনে এখন সব ছাই। চোখে মুখে কেবলই অন্ধকার দেখছি। বনগ্রাম কিমস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, সংঘর্ষের পর আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসা ছেড়ে দিয়েছে। মাগুরার ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনি। ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ৩০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি জানান। মহম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমরা দুই পক্ষকে নিবৃত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে । ১৩ জনকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হযেছে। এঘটনায় একটি মামলা  হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com