প্রথম পাতা » ফিচার » বিশেষ প্রতিবেদন : শ্রীকৃষ্ণের শুভ আর্বিভাব তিথি

বিশেষ প্রতিবেদন : শ্রীকৃষ্ণের শুভ আর্বিভাব তিথি

বিশেষ প্রতিবেদন : শ্রীকৃষ্ণের শুভ আর্বিভাব তিথি

অরুন শীল: অনুগ্রহায় ভূতানাং কৃপা করে তিনি এলেন এই ধূলির ধরায়, আমাদের আঙ্গিনায়। বিগলিত করুনায় দ্বাপরের যুগ সন্ধিক্ষণে রোহীনি নক্ষত্রের মহাঅষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আর্বিভাব এই মাটির পৃথিবীতে। ভাদ্র মাসের অষ্টমী তিথি, মধ্যরাত্রির নিবিঢ় অন্ধকারে ভুবন আবৃত। সকলে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। এরকম সময়ে শঙ্খ- চক্র -গদা- পদ্মধারী-চতুর্ভুজ মূর্তিতে কংসের কারাগারে আবির্ভূত হলেন শ্রীহরি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাকে কেন্দ্র করেই জন্মাষ্টমী উৎসব। ভগবান অবতরণ করলেন মানুষের ঘরে। চৈতন্য চরিতামৃতে বলা হয়েছে “কৃষ্ণ-সূর্যসম,মায়া হয় অন্ধকার। “যাঁহা কৃষ্ণ, তাঁহা নাহি মায়ার অধিকার”-জড় জগতের পালনকর্র্তা হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অংশ প্রকাশ মহাবিষ্ণু। ভগবান যখন অবতরণ করেন, তখন বিষ্ণুর থেকে সেই অবতারের প্রকাশ হয়।
মহাবিষ্ণু হচ্ছেন জড়সৃষ্টির আদি কারন, তাঁর থেকে গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর প্রকাশ হয়, এবং তারপর ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুর প্রকাশ হয়। সাধারনত এই জড় জগতে ভগবানের অবতারেরা ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণু থেকে প্রকাশিত হন। তাই এই পৃথিবীর পাপভার হরণ করার জন্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গ্রহন করেন না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন অবতরণ করেন তখন সমস্থ বিষ্ণুপ্রকাশেরাও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন। শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন প্রকাশ, যেমন নারায়ণ,বাসুদেব, সস্বকর্ষক, প্রদ্যুম্ন এবং অনিরুদ্ধ-এই চতুর্ব্যূহ, মৎস্য আদি কলা অবতার,এবং অন্যান্য যুগাবতার ও মন্বন্তর অবতার, এরা সকলেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরীরে প্রকাশিত হন। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পুর্ণ পুরুষোত্তম এবং সমস্ত অংশপ্রকাশ এবং অবতারেরা সর্বদাই তাঁর মধ্যে বর্তমান থাকেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন অবতরণ করেন, তখন শ্রীবিষ্ণুও তাঁর সঙ্গে থাকেন। তাঁর বৃন্দাবনলীলা প্রদর্শন করে অতি সৌভাগ্যবান বদ্ধ জীবদের ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই কেবল শ্রীকৃষ্ণ অবতরণ করেন। ভগবদগীতার অষ্টম অধ্যায়ের বিংশতি শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, এই জড় জগতের উর্দ্ধে আর একটি প্রকৃতি রয়েছে যা নিত্য, শাশ্বত এবং সনাতন, তা হচ্ছে পরাপ্রকৃতি।
এই জড় প্রকৃতিকে আমরা জড় চক্ষুর দ্বারা দর্শন করতে পারি। অসংখ্যা গ্রহ-নক্ষত্র, যেমন চন্দ্র, সুর্য্য, তারকা ইত্যাদি আমরা আমাদের জড় চক্ষু দিয়ে দর্শন করতে পারি, কিন্তু প্রকট প্রকৃতির অতীত এক অপ্রকট জগৎ রয়েছে, যা জড় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধ হয় না। ভগবদগীতায় সেই প্রকৃতিকে পরা এবং শাশ্বত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই জড় জগতের মতো সেই জগতে সৃষ্টি এবং ধ্বংস নেই। সেই জগৎ নিত্য, সনাতন, চিরকাল বর্তমান থাকে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম ধামকে ব্রহ্মসংহিতায় চিন্তামণিধাম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গোলোক বৃন্দাবন নামক শ্রীকৃষ্ণের যে ধাম, তা চিন্তামণি বা পরশমণি দ্বারা রচিত। শুভ জন্মাষ্টমী- সনাতন তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের পরম পুরুষ নিখিল বিশ্বের অধিশ্বর পরাৎপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি বা আবিভাবের মাহেন্দ্রক্ষন। জন্মষ্টমী তিথিতেই শান্তিদাতা আসিলেন বসুধায়। রুপ-রশ-গন্ধময় আলোকিত শুভ্ররশ্নির বিছুরনে শ্রীবিষ্ণু আসিলেন মানব কল্যানে মানবের আঙ্গিনায়। সেদিন ভগবান তাঁর ভগবত্ত ভুলে শুধু মানুষ হিসেবে ধরা দিয়েছেন ধরাধামে।
আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ৫শত বছর র্পূবের কথা। তিনি জন্ম নেন মধুরার রাজা কংস সেনের কারাগারে। নিবিড় অন্ধকারে বর্ষনমূখর, মাহাভাদরে অনাদরে অনাড়ম্বর ভাবে দেবকী ও বসুদেবের বেদাহত ক্রোড়ে। দেবতারা পুরুষ-সুক্ত স্তব করা সত্বেও যখন পরমেশ্বর শ্রীবিষ্ণু প্রসন্ন হলেন না তখন ব্রক্ষা স্বয়ং তপস্যা করতে শুরু করলেন। সেই সময় ভগবান শ্রীবিষ্ণু প্রসন্ন হলেন। এবং জানালেন তিনি অচিরেই তাঁর পরাশক্তিসহ অসুর সংহার করার জন্য পৃথিবীতে অবতরন করবেন। এবং তখন দেবতারাও যেন তাঁর সহায়তা করার জন্য পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তাঁরা যেন অচিরেই যদুকূলে জন্মগ্রহন করেন, সেই কূলে তিনি স্ময়ং আর্বিভূত হবেন। পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বসুদেবের পুত্র রুপেই আর্বিভূত হবেন।
এই বিষয়ে শ্রীমদ্ভাগবতে“ তৎ প্রিয়ার্থং” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ যে ভগবানের সন্তুষ্ট্ িবিধানের জন্য কার্য করেন। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হলো- ঈশ্বর: পরম: কৃষ্ণ— সর্বকারণম কারণ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণই হলেন সর্বকারনের কারণম। ব্রহ্মা হলেন সৃষ্টির কাজে নিযুক্ত শ্রীহরির প্রতিনিধি এবং দেবাদিদেব মহেশ্বর ধ্বংস কার্য সম্পাদন করার জন্য। ১২৫ বছর মোট চারটি ভূমিকায় ভগবানের লীলা বিস্তৃত। বৃন্দাবন, মথুরা, কুরুক্ষেত্র এবং দ্বারকা লীলা। এর মধ্যে ১১ বছর বৃন্দাবন লীলা। ২৩ বছর থেতে তিরোভাব পর্যন্ত দ্বারকা-কুরুক্ষেত্র লীলা যা সমসাময়িক। কৃষ্ণের অষ্টতর শতনাম। প্রত্যেকটি নামেই তার এক একটি বিশেষত নিহিত এবং তাৎপর্যমন্ডিত। শ্রীম্দভাগবত গীতায় তাঁকে বলা হয়েছে পুরুষোত্তম, ভাগবত পরিচয় দিয়েছে গূঢ়কপট মানুষ, মহাপ্রভু চৈতন্যদেব পরিচয় দিয়েছেন সচ্ছিদাœ্দ, জ্ঞানীরা বলেছেন জগৎগুরু, ভাগবতের ১০ স্কন্ধে বলা হয়েছে এতেচাংশ কলাপুংস কৃষ্ণস্তু ভাগবান স্বয়ং।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মূখনি:শৃত বাণী শ্রীম্দভাগবত গীতায় ৪র্থ অধ্যায়ের ৭ ও ৮ নং শ্লোকে বির্ধত রয়েছে “ যদা যদাহি ধমর্স্য গ্লানি ভর্বতি ভারত। অভ্যূত্থানম ধর্মস তদাত্মানাং সৃজামহম, পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুস্কৃতাম, ধর্মসংস্থাপনাথায় সম্ভাবামি যুগে যুগে”। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মূলঅভয়বাণী- বা গীতোক্ত ধর্মের সার কথা, যাকে বলা হয় ভগবৎ ভক্তি শরণাগতি বা আত্ম সমর্পন। ইংরেজিতে যার অর্থ Complete Surrender to The Almighty. নব নব ভাব সাধনার অবিশ্বরণীয় মূল আশ্রয় হয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। নরদেহে তিনি আমাদের অবতার। নরদেহে ক্ষেত্র ধর্ম অবলম্বন করে তাকে ব্যবহার করতে হয়। তাই নিজ মাহাত্ম্য প্রকাশকর্মে যুগের প্রয়োজনে অনন্তশক্তিকে সীমিত করে তিনি বিভিন্ন লীলা সৃষ্টি করেছেন।  কৃষ্ণ লীলা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত ও ব্যাখ্যাত, তিনি একাধারে বৃন্দাবনের মহাপ্রেমিক, দ্বারকার রাষ্ট্রনায়ক, হস্থিনার রাজণিিতক, কুরুক্ষেত্রের ধর্মের উপদেষ্টা ও দার্শনিক। তিনি সংসারী, সন্যাসী, রাজা, ভিখারী, যোদ্ধা, অহিংসার প্রতিক। তিনি মনুষ্যত্বের এক মূর্ত প্রতিক। গীতোক্ত ধর্ম মানবতার মুক্তি সনদ, পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও পরধর্মে সহিষ্ণু, এতবড় মানবতাবাদী ধর্ম গোটা বিশ্বে আর নেই। এ ধর্ম ভক্তের কাছে দেয়া জন্মমৃত্যুরুপ সংসার বন্ধন তথা কর্ম বন্ধন থেকে মুক্তি প্রদানের অভয়বাণী ও প্রতিজ্ঞা করেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।কিন্তু বর্ণবৈষম্যবাদী কুসংস্কারচ্ছন্ন হিন্দু সমাজ ও ধর্মীয় ব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্রমে ধর্মের মূল অদ্যাত্ববাদ ছেড়ে হিন্দু ধর্ম আজ অচার আচরণহীন সর্বস্ব ধর্মে রুপ লাভ করতে বসেছে। আধ্যাত্বিকতায় আত্মন্নোতির জন্যই হিন্দু সমাজ এক সময় সেরা জাতি হিসেবে গর্বিত শিরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আজ বর্ণবৈষম্য-গোড়ামী-অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার ভরা হিন্দু সমাজ অধ:পতিত এক আত্ববিস্বৃত জাতিতে পরিনত হতে চলেছে।
লীলাপুরুষত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধরাধামে আর্বিভূত হয়ে আমাদের জন্য যে দিব্য জীবনের আদর্শ রচনা করে গেছেন, তার মূল রহস্য আত্বস্থ করে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়পরায়নতায় অমৃতলেঅকের অন্বেষায় শুরু হোক আমাদের অভিযাত্রা। ভগবানের মুখনিসৃত বানীর আলোকে সমস্থখ মানবীয় সংকীর্ণতাকে পরিহার করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও মানব কল্যাণব্রতে আমাদের অঙ্ঘকিার হোক জীব সেবা। আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীর সকল ধর্মের মর্মবাণীই এক এবং অভিন্ন। মৌলিক বিষয়ে কোন প্রভেদ নেই। প্রভেদ যা রয়েছে তা মূলত প্রথাগত ও আনুষ্টানিকতায়। মানুষের কল্যানের প্রয়োজনে ধর্মের উৎপত্তি । আজকের এই শুভ দিনে আমাদের বিনম্র প্রার্থনা র্পতিবীর সকল প্রাণী সুখি হোক, ধর্মের কল্যাণ পরশে উদ্ভাষিত হোক মানবতা, সত্য সুন্দরের আলোতে আলোকিত ধারায় অভিসিঞ্চিত কোক তাপিত বসুন্ধরা।
হরেকৃষ্ণ-শুভমস্তু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com