প্রথম পাতা » Featured » জজ পরিবারের নির্যাতন ও বন্ধিদশা থেকে মুক্তি পেতে পালিয়েছে শিশু গৃহ কর্মী

জজ পরিবারের নির্যাতন ও বন্ধিদশা থেকে মুক্তি পেতে পালিয়েছে শিশু গৃহ কর্মী

জজ পরিবারের নির্যাতন ও বন্ধিদশা থেকে মুক্তি পেতে পালিয়েছে শিশু গৃহ কর্মী

প্রতিদিন ডেস্ক: ঢাকার উত্তরায় একটি বাড়িতে খাদিজা নামে একটি শিশু গৃহপরিচারিকাকে ১৫ মাস ধরে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবারটির নির্মমতার শিকার শিশুটি শনিবার ভোরে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে নিজ গ্রামের বাড়ি মাগুরার বাগডাঙ্গা গ্রামে ফিরলে তাকে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিযুক্ত গৃহকর্তার গ্রামের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বড়ুরিয়া গ্রামে। বর্তমানে তিনি ঢাকায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধিন জাতীয় আইন সহায়তা প্রদান সংস্থার উপ-পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে কর্মরত।

নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহপরিচারিকা খাদিজা (১২) মাগুরার শালিখা উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের দরিদ্র কৃষক মোসলেম সরদারের মেয়ে। গত বছরের জুলাই মাসে খাদিজার মামা আবুল বাশার তাকে গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য ঝিনাইদহের একটি বাড়িতে রেখে যান। সেখান থেকে ওই পরিবারের জামাতা আইন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত রাকিবুল ইসলাম ঢাকার উত্তরায় ৭নং রোডের নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। এতদিন মেয়েটি সেখানেই গৃহকর্মের কাজ করতো। কিন্তু শনিবার ভোরে সে ঢাকা থেকে শরীরে প্রচ- জ্বর নিয়ে একাএকা গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসলে পরিবারের লোকের তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে।

মাগুরা সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধিন খাদিজা কাঁদতে কাঁদতে Magura-02-Childজানায়, গৃহকর্তা রাকিবুল ইসলামের ঢাকায় অনেক বড় বাসা। কিন্তু এতবড় বাসায় কাজ করতে তার কষ্ট হয়। সব কাজ তার পক্ষে করাও কঠিন। তারপরও ঘরের যাবতিয় কাজ শেষ করে গভীর রাতে তাকে গোসল করতে হয়। এর ভিতর কাজে কোনরকম কম পড়লে গৃহকর্তার স্ত্রী শামিমা জাহান সুমি তার উপর চালান নানা শারীরিক নির্যাতন। একমাস আগে ধারালো বটি দিয়ে তার দুই হাতে কোপ দিলে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়। একদিন সবজি কাটা ছুরি তার হাতের ভিতর ঢুকিয়ে দিলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সারাঘর রক্তে ভেসে যায়। আরেকদিন তার পায়ের উপর গরম পানি ঢেলে দিয়েছে। রাগের বসে ন্যাড়া করে দিয়েছে মাথার চুল। দিনের পরদিন এইভাবে নির্যাতন চালালেও কখনো তার চিকিত্সার জন্য কোন ওষুধ পর্যন্ত তারা কিনে দেননি। ওই বাড়ির ড্রাইভার মানিক গোপনে তাকে ওষুধ কিনে দিলে সেগুলো খেয়েই সে সুস্থ্য হয়ে ওঠে। তবু জজ পরিবারের মন তার প্রতি সদয় হয়নি।

খাদিজা জানায়, সারাদিন ধরে কাজ করলেও তার জন্য কেবলমাত্র দুপুরে একবার খাবার জুটতো। তাও পচা বাশি। যা অনেক সময়ই ফেলে দিতে হয়েছে। খাবার কষ্ট ছাড়াও দিনের পর দিন নানা অজুহাতে তার উপর নির্যাতন চালানোর কারণে প্রায়ই সে ফিরে আসার কথা বলেছে। কিন্তু এতে নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়েছে।
এমনিভাবে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে জজ রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী সুমি তাকে মারতে মারতে ঘর থেকে বের করে দরজা বন্ধ করে দেয়। তখন নিরুপায় হয়ে সে বাড়ির ছাদে গিয়ে সারারাত বসে থাকে। পরে ভোর হলে ছাদ থেকে নেমে বাড়ির দারোয়ানকে পাউরুটি কিনে দেবার কথা বলে দোকানে পাঠিয়ে সেই ফাকে ওই বাড়ি থেকে বের হয়। অপরিচিত শহর ঢাকা। তারপরও হাটতে হাটতে অনেকদূর যাবার পর রাস্তার পাশে একজন পুলিশ অফিসারকে দেখতে পেয়ে সব কথা খুলে বলে তাকে। তখন সদয় হয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে একশ টাকা দেন। যা দিয়ে সে শেষ পর্যন্ত গাড়িতে চড়ে মাগুরায় ফিরে আসে।

মাগুরা সদর হাসপাতালে চিকিত্সারত খাদিজার পাশে উপস্থিত তার মামা আবুল বাশার জানান, রাকিবুল সাহেব খাদিজাকে পরিবারের সদস্যদের মতো রাখবেন এই কথা বলেই ঢাকায় নিয়ে যান। তিনি দীর্ঘদিন যুগ্ম জেলা জজের দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ সেই তিনিই একটি শিশুর উপর অবিচার করেছেন। দিনের দিন পরদিন তার উপর নির্যাতন চালিয়েছেন জেনে খুবই কষ্ট লাগছে।

খাদিজার শরীরে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত চিহ্নগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে ঢুকরে কেঁদে ওঠেন সেখানে উপস্থিত মা ডালিম বেগম। তিনি বলেন, কাজের জন্য প্রতি মাসে মাত্র এক হাজার টাকা দিয়েছে। আর পনেরটি মাস ধরে মেয়ের উপর নির্যাতন করেছে। হে আল্লাহ তুমি এর সুষ্ঠু বিচার করো।

এ বিষয়ে মাগুরা সদর হাসপাতালে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিত্সক মোহাইমিনুল হক বলেন, মেয়েটির শরীরে বেশকিছু ওল্ড ইনজুরি রয়েছে। অভিজ্ঞ চিকিত্সকরা দেখার পর তাকে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দিতে পারবেন।
এদিকে খবর পেয়ে মাগুরা সদর থানার এসআই তৌহিদ হাসপাতালে গিয়ে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের সামনেই মোবাইল ফোনে কথা বলেন অভিযুক্ত রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে। কিন্তু তিনি ঢাকার বাইরে থাকায় পরে কথা বলবেন বলে কথা শেষ করেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবার পর উভয়ের কথোকথনের বিষয়টি এসআই তৌহিদ সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করেন। এরপরই গৃহপরিচারিকা খাদিজা এবং তার পরিবারের দেয়া অভিযোগের বিষয়ে রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে এই প্রতিবেদক সহ স্থানীয় সাংবাদিকরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুন্সী আসাদুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থল মাগুরা নয়। তাছাড়া শিশু গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের বিষয়ে তার কাছে কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com