প্রথম পাতা » মাগুরা সদর » শহীদ হেলেন হত্যার বিচার আজো হলো না

শহীদ হেলেন হত্যার বিচার আজো হলো না

শহীদ হেলেন হত্যার বিচার আজো হলো না

প্রতিদিন ডেস্ক: আজ ৫ অক্টোবর। মাগুরার বীর মুক্তিযোদ্ধা  লুৎফুন্ নাহার হেলেন-এঁর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। একাত্তরের ৫ অক্টোবর মাগুরার কুখ্যাত রাজাকার রিজু-কবীর জুটি পাকসেনাদের সহায়তায় নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বীরকন্যা হেলেনকে। দীর্ঘ ৪৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী  শহীদ লুৎফুন্নাহার হেলেন হত্যার বিচার আজো হয়নি। শুধুমাত্র সঠিক উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাবে এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার দেখতে পেল না মাগুরাবাসী। ফল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেল হেলেনের কূখ্যাত খুনীরা। দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলমান রয়েছে তখন হেলেন হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়ায় মাগুরার স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের সংক্ষুব্ধতার শেষ নেই। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১০ মে মাগুরার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তৎকালীন মাগুরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার খান আলী রেজা মামলা দায়ের করলেও তার কোনো অগ্রগতি হয়নি। বছর দুয়েক আগে খান আলী রেজা ইন্তেকাল করেন।

দেশের যে সব বীরকন্যার রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে একাত্তরের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল তাঁদেরই একজন লুৎফুন্নাহার হেলেন। হেলেন ছিলেন মাগুরা শহরের অন্যতম শিক্ষিত, সমাজ সচেতন এবং প্রগতিশীল পরিবারের এক বিপ্লবী কন্যা। তাঁর বাবার নাম মরহুম ফজলুল হক, মায়ের নাম মরহুমা সফুরা খাতুন। বড় ভাই-এর নাম মাহফুজুল হক নিরো। যিনি মাগুরাতে ‘নিরো প্রফেসর’ হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত। স্কুল জীবন থেকেই শহীদ হেলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন-এর কর্মী হিসেবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। একসময় মাগুরা মহকুমা শাখার সভানেত্রী হন। মেধাবী ছাত্রী হেলেন ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর মাগুরা গার্লস স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

একাত্তরে হেলেনার মৃত্যুর ঘটনা ছিল খুবই করুণ এবং মর্মান্তিক। যে স্মৃতি মাগুরাবাসীর হ্নদয় থেকে আজো মুছে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে হেলেন নিজের বিশ্বাস আর ভাবনার প্রতি অবিচল থেকে স্বাধীন দেশ করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে মাগুরার তৎকালীন মোহম্মদপুর থানার কোনো এক গ্রামে আবস্থানকালে রাজাকার ও আলবদর চক্রের গুপ্তচররা তার গোপন অবস্থানের কথা ফাঁস করে দেয়। অতঃপর চরমভাবে ঘৃণিত রাজাকার রিজু-কবীরের নেতৃত্বধীন একটি দলের হাতে ধরা পড়েন হেলেন। সে সময় তার কোলে ছিল শিশুপুত্র (মাত্র চার মাস বয়সী, এখন আমেরিকাতে থাকে) দিলীর। পাষন্ড রাজাকাররা হেলেনকে ধরে এনে মাগুরা শহরে স্থাপিত পাকসেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসে এবং সেখানে উর্ধ¦তন পাকসেনাদের হাতে তাঁকে তুলে দেয়। পাকসেনারা হেলেনের শিশুপুত্র দিলীরকে হেলেনের পিতা মাতার কাছে ফেরত দিলেও শত অনুরোধ স্বত্ত্বেও হেলেনকে ফেরত দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এই ঘটনা পুরো মাগুরাবাসীর মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করলেও সেসময় রাজাকারদের ভয়ে মুখ খুলতে কেউ সাহস করেনি। এদিকে পাকসেনাদের ক্যাম্পে নেওয়ার পর হেলেনার ওপর অকথ্য নিপীড়ন নির্যাতন চালানো হয়। একসময় তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর আরো নির্মমতার পরিচয় দেয় পাকসেনা এবং তাদের পা চাটা রাজাকার রিজু কবীর চক্র। ৫ অক্টোবর হেলেনার মৃতদেহ পাকসেনাদের জীপের পেছনে বেঁধে শহর দিয়ে টেনেছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এভাবেই টানতে টানতে সেই ছিন্ন ভিন্ন রক্তেভেজা বীরকন্যার দেহটি খুনীরা মাগুরার নবগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। মুক্তিযোদ্ধা হেলেন-এর মৃতদেহ আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হেলেন হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়া প্রসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, একাত্তরে মাগুরায় সংঘটিত এরকম একটি নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়া খুবই দুঃখজনক। এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কুখ্যাত রাজাকার রিজু-কবীর জুটির রিজু মারা গেলেও কবীরসহ আরও অন্যান্যরা বেঁচে রয়েছেন। সরকার চাইলে এই হত্যাকান্ডের বিচার করা অসম্ভব কিছু নয়। সেটি করা হলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি এবং মাগুরার সাধারণ জনগণ খুশি হতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com