প্রথম পাতা » ফিচার » জননেতা মো. আছাদুজ্জামান: জাতীয় সংসদের উচ্চকিত এক কণ্ঠস্বরের কথা

জননেতা মো. আছাদুজ্জামান: জাতীয় সংসদের উচ্চকিত এক কণ্ঠস্বরের কথা

জননেতা মো. আছাদুজ্জামান: জাতীয় সংসদের উচ্চকিত এক কণ্ঠস্বরের কথা

জাহিদ রহমান: ২৫ ডিসেম্বর ছিল মাগুরা থেকে চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আছাদুজ্জামানের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর এই জননতো সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের যেসব তৃণমূল রাজনীতিকগণ আপন মেধা, দক্ষতা, প্রজ্ঞা এবং সততায় নিজেদের রাজনৈতিক জীবনকে আলোকিত করে সাধারণ জনগণের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন মো. আছাদুজ্জামান। মাগুরার ‘আছাদ সাহেব’ হিসেবে যিনি সর্বসাধারণ্যে পরিচিত ছিলেন। নব্বই-এর অভূত্থান পরবর্তীতে ৯১ সালে চৌকষ এই রাজনীতিবিদ শেষবারের মতো মাগুরা ২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে বার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনেক জাতীয় নেতা পরাজিত হলেও মাগুরা ২ আসন থেকে আছাদুজ্জামান ৬১,০৬৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিপরীতে বিএনপি থেকে মনোনীত প্রার্থী মে. জে. (অব.) মজিদ উল হক পান মাত্র ৩২২৬৬ ভোট। শেষবারে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদ সদস্য ভবনের এক নম্বর ব্লকের ১০ নম্বর রুমে থাকতেন তিনি। ওখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আছাদুজ্জামান ৭০ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এমএলএ নির্বাচিত হন। এই ধারাবাহিকতায় ৭২ সালে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সংবিধান প্রণয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ৭৩ সালে মনোনয়ন বঞ্চিত হলেও ৭৯ সালে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দুর্দিনে ফের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জননেতা হিসেবে আবিভর্ৃূত হন। উল্লেখ্য জিয়াউর রহমানের আমলে এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মাত্র ৩৯ জন সংসদ সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। খুলনা অঞ্চল থেকে একমাত্র তিনিই নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। এরপর ৮৬ এবং ৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি রীতিমতো রেকর্ড গড়েন। জাতীয় সংসদের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু নিজেকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আগেই তার জীবনের অবসান ঘটে। ৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর তাঁর অকস্মাৎ অকাল প্রয়াণ সবাইকে স্তম্ভিত করে দেয়। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চলে যান তিনি। সেদিন শোকে বিহবল হয়ে পড়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ মাগুরার সমগ্র মানুষ। অনেকে নিরবে চোখের জল ফেলেন। ঐদিন ঢাকা থেকে সরকারি হেলিক্যাপ্টারে করে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মাগুরাতে। দুটি জানাজা শেষে তাঁকে সমাহিত করা হয় মাগুরা ভায়না মোড়ে অবস্থিত পৌর গোরস্থানে। তাঁর জনাযায় দল মত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল তিনি কতোটা জনপ্রিয় এক নেতা ছিলেন। তাঁর প্রয়াণের ২৪টি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও ‘ভ্যাটার্ন পার্লামেন্টারিয়ান’ হিসেবে খ্যাত আছাদুজ্জামান চিরঅমলিন হয়ে আছেন প্রতিটি মানুষের হ্নদয়ে। তাঁর চলে যাওয়ার পর মাগুরাতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ হয় তা আজো অবশ্য পূরণ হয়নি। আছাদুজ্জামান ছিলেন একজন চৌকষ, বাকপটু, দক্ষ পার্লামেণ্টারিয়ান। পার্লামেণ্টে দাঁড়িয়ে তিনি সর্বদাই গুছিয়ে যুক্তি দিয়ে তথ্য-উপাত্তের চমৎকার সমাহারে কথা বলতেন। যুক্তির বাইরে তিনি কখনই যেতেন না। বরাবরই তাই রাজনৈতিক যুক্তির সৌন্দর্য দিয়েই তিনি প্রতিপক্ষের সবকিছুর জবাব দিতেন। পার্লামেন্টারিয়ান কোড অফ কন্ডাক্ট তিনি কখনই ভঙ্গ করেননি। এ কারণেই স্বাধীনতা পরবর্তীতে তিনি একজন দক্ষ সৃষ্টিশীল পার্লামেন্টারিয়ানের স্বীকৃতি পান। তাঁর অকাল প্রয়াণের পর সে কথা নিজ দল এবং দলের বাইরের প্রবীণ, বর্ষিয়ান সবনেতাই অকপটে স্বীকার করে গেছেন। আর তাই আছাদুজ্জামানের মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদে তাঁকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। পার্লামেন্টের প্রসিডিংস থেকে দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুর দু মাস পর ৯৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরু হলে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত বিরোধী দলীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, মরহুম আছাদুজ্জামান একজন প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান। তিনি ১৯৭০ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর বিণয়ী ব্যবহারে দল-মত নির্বিশেষে সকলেই মুগ্ধ হয়েছি। স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের একজন রাজনৈতিক হিসেবে তিনি অনেক অবদান রেখেছিলেন। সেদিন স্পিকারকে লক্ষ্য করে তিনি আরও বলেন, তাঁকে আমরা চিরদিন স্মরণ করব সে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবের সঙ্গেও লোক যারা ছিলেন তাঁদেও মধ্যে অন্যতম। এরপর আলোচনায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, মাননীয় স্পীকার, আছাদুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে ১৯৭০ সনে পার্লামেন্টে আমার পরিচয় হয়। তিনি একজন সদালাপী, অজাতশত্রু এবং সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তাঁকে প্রবীণ বললে ঠিক হবে না, তিনি একজন প্রবীণতম পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। তিনি শুধু পার্লামেন্টারিয়ানই ছিলেন না।পার্লামেন্টারি পলিটিকসের উপরে তাঁর যে, আন্তরিকতা এবং কমিটমেন্ট টু দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি এই ধরনের সিনসিয়ারিটি আমি অনেক পার্লামেন্টারিয়ানের জীবনে কখনো দেখি নাই। তাঁকে পার্লামেন্টারী পলিটিক্সের একজন শিক্ষক বলা যায়। তিনি নিজে ব্যক্তিগত জীবনে ওকালতি করতেন তাই গণতন্ত্রের উপাদান এবং পার্লামেন্টারী পলিটিক্স করতে গিয়ে লেজিসলেশন, জুডিশিয়ারি এবং এক্সিকিউটিভ- এই তিনটি জিনিসের উপরে তাঁর বিশ্বাস ছিল অবিচল। সেদিন আরেক পার্লামেন্টারিয়ান ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আছাদুজ্জামান একজন নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। তাঁর সংবেদনশীলতা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই। তিনি একজন ত্যাগী মানুষ ছিলেন। আমরা অনেকেই সংসদ সদস্য হিসাবে নানারকম ভূমিকা পালন করেছি। কিন্তু আছাদুজ্জামান একটি নির্দিষ্ট লাইনে অগ্রসর হয়েছেন। এবং আমি তাঁকে বাংলাদেশের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান হিসাবে আখ্যায়িত করতে চাই। তিনি পার্লমেন্টারিয়ান হিসাবে আমাদের দেশে সুখ্যাতি অর্জন করে গেছেন। একইভাবে সংসদের উপনেতা ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, জনাব আছাদুজ্জামান একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ বা সাধারণ সদস্য ছিলেন না। তিনি বেশ কয়েকবার জনপ্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হয়ে এই সংসদে এসেছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি যেমন সৎ ছিলেন, রাজনৈতিক সততাও তাঁর মধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। তিনি যুক্তিবাদী ছিলেন, অত্যন্ত ধীরস্থির ছিলেন, ব্যালেন্স পার্লামেণ্টারিয়ান ছিলেন। আজকে রাজনীতির বিরুদ্ধে অনেকের অনেক বক্তব্য হয়, রাজনীতিবিদদের সম্বন্ধে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু আছাদুজ্জামান সাহেবের মত অনেক লোকই আছেন যারা সারা জীবন রাজনীতি করেছেন, কিন্তু কিছুই পাননি। তিনি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রাজনীতিকদের জীবন এই রকমই হওয়া উচিত, মাননীয় স্পীকার। আসলেই অ্যাডভোকেট আছাদুজ্জামান ছিলেন সাদাসিধে অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত এক বিশুদ্ধ রাজনীতিক। মুজিব আদর্শের এই সৈনিক যতদিন বেঁচে ছিলেন দেশ এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করেছেন। বলতে দ্বিধা নেই এ দেশের অজপাড়া গাঁয়ে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক তৃণমূল থেকে উঠে এসে যেভাবে ন্যাশনাল পার্লামেন্ট আলোকিত করেছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা অমলিন হয়ে থাকবে চিরকাল। এমন বাকপটু পার্লামেন্টারিয়ান আজীবনই আমাদের অহংকারের বড় এক উপাদান। আর তাই এখনও এই কণ্ঠস্বর আমাদের মনকে নাড়া দেয়। পার্লামেন্টের শিক্ষাগুরু হিসেবে এখনও অনেকেই প্রয়াত আছাদুজ্জামানকে স্মরণ ও সমীহ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo_image
সম্পাদক: জাহিদ রহমান
নির্বাহী সম্পাদক: আবু বাসার আখন্দ
প্রকাশক:: জাহিদুল আলম
যোগাযোগ:
পৌর সুপার মার্কেট ( দ্বিতীয় তলা), এমআর রোড, মাগুরা।
ফোন: ০১৯২১১৬১৬৮৭, ০১৭১৬২৩২৯৬২
ইমেইল: maguraprotidin@gmail.com