আজ, বুধবার | ২০শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং | রাত ৪:০২

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরা আওয়ামীলীগ সভাপতি তানজেল হোসেন খানের ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় কর্মসূচি গ্রহণ মাগুরা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে কোষাধ্যক্ষ পদে জাসদ নেতা মিজানের বিজয় মাগুরা পৌরসভা নির্বাচনে কে পেলেন কত ভোট মাগুরায় আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীলীগপন্থীদের বিজয় মাগুরা পৌরসভায় বিশাল ব্যবধানে জয় পেলেন খুরশীদ হায়দার টুটুল ইভিএমে ভোটগ্রহণ একটি স্মার্ট পদ্ধতি-এমপি শিখর মাগুরায় শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন মাগুরায় ক্রিকেটার সাকিবের দাদির দাফন সম্পন্ন মাগুরায় ইয়াং স্টার একাডেমির যুগপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা শ্রীপুরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে হুইল চেয়ার বিতরণ
মনোয়ারা জামান : জননী’র জন্য শোকগাঁথা

মনোয়ারা জামান : জননী’র জন্য শোকগাঁথা

জাহিদ রহমান : ২৮ জুন চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন মাগুরার প্রয়াত জননেতা অ্যাডভোকেট মো. আছাদুজ্জামানের সহধর্মিনী আমাদের সবার শ্রদ্ধেয়া মনোয়ারা জামান।

মাগুরা ১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. সাইফুজ্জামান শিখরের মা তিনি। তাঁর বড় মেয়ে কামরুল লায়লা জলিও বিগত সংসদে সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন। কিন্ত এসব পরিচয়ের বাইরে দলীয় নেতা, কর্মী আর মাগুরার সাধারণ মানুষের কাছে মনোয়ারা জামানের পরিচয়ের দ্যুতি ছড়িয়েছিল সাদাসিদে এক ‘স্নেহময়ী জননী’ হিসেবে।

সত্যিকার এক গ্রামীণ মায়ের সুন্দর স্নিগ্ধ রুপ ছিলেন তিনি।বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসার প্রতিচ্ছবি ছিল মনোয়ারা জামানের মাঝে। হাসিমুখে সবার সাথে মিশতেন, কথা বলতেন, আদর আপ্যায়ন করতেন। স্বামী আছাদুজ্জামান একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও কোনোদিন তাঁর মধ্যে সামান্যতম অহমিকা-আত্মহংকার কেউ খুঁজে পাননি। বরং বরাবরই অতি সাধারণ থেকেছেন।

প্রতিটি মানুষকেই তিনি ভালবাসতেন হ্নদয় দিয়ে। যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিনই মানুষকে কাছে টেনেছেন, কথা শুনেছেন। সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তাঁর বাড়িতে কেউ এলে খালিমুখে বিদায় করেননি কখনও। আছাদুজ্জামান বেঁচে থাকতে দলীয় নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। ‘ভাবী’ হিসেবে সবার কাছে তিনি প্রিয় ছিলেন। দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে, দুঃসময়ে নিজের আঁচল খুলে অর্থ দিতেও কার্পণ্য করতেন না। রাত দুপুরে নেতা-কর্মীদের জন্য গরম ভাত রান্না করা, সবাইকে খাওয়ানো, শোবার ব্যবস্থা করা-এসব তিনি করেছেন সারাজীবন। আবার বিভিন্ন আন্দোলনের সময় পুলিশের হাত থেকে নেতা কর্মীদের রক্ষা করতে বাড়িতে লুকিয়ে রাখা এরকম বহুঘটনা তিনি সামলেছেন ঠান্ডা মাথায়। স্বামী আছাদুজ্জামানকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিকশিত ও জনপ্রিয় করতে মনোয়ারা জামানের অবদান ও অনুপ্রেরণা বলে শেষ করা যাবে না। আছাদুজ্জামানের জেল জীবন এবং নিপীড়ন নির্যাতনের কালে তিনি পুরো পরিবার নিয়ে একা সংগ্রাম ও লড়াই করেছেন। তাঁর আত্মত্যাগের কাহিনীও অনেক বড়।

মনোয়ারা জামান বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসতেন। ভীষণরকম ভালবাসতেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। আর তাই আওয়ামী রাজনীতির মহাসংকটকালেও স্বামীর সাথে তিনিও বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শে অটুট থেকেছেন। শত প্রলোভনের হাতছানি এলে তা নির্ভয়ে প্রত্যাখান করেছেন।

জিয়াউর রহমানের আমলে মো. আছাদুজ্জামানকে একাধিকবার নানা ধরণের অফার করা হয়েছিল। স্বয়ং জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন আছাদুজ্জামান তাঁর মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করুক। কেননা জিয়ার আমলে ৭৯ এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বৃহত্তর যশোর জেলা থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনিই একমাত্র নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্ত জিয়াউর রহমানের সেই অনুরোধের কথা শুনেই নাকচ করে দিয়েছিলেন মনোয়ারা জামান।

 

স্বামী আছাদুজ্জামান একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও স্ত্রী হিসেবে মনোয়ারা জামান সারাজীবনই অতি-সাধারণ থেকেছেন। কখনই বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কথা চিন্তা করেননি। বরং জনগণের সাথে মিশে থেকেছেন। স্বাধানীতার পর মো. আছাদুজ্জামান পর পর তিনবার (কথিত ৮৮ এর নির্বাচন ছাড়া) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ঢাকাতে কখনই প্লট, ফ্ল্যাট নেওয়ার কথা চিন্তা করেননি। এমন কী সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো গাড়িও ছিল না। সংসদ অধিবেশনের আগে আছাদুজ্জামান যখন মাগুরা থেকে ঢাকাতে সংসদ হোস্টেলে আসতেন মনোয়ারা জামান তখন বাজার করে সব গোছগাছ করতেন। মাগুরা থেকে সবজি, মাংস কিনে ঢাকায় নিয়ে আসতেন। সোহাগ বা ঈগল পরিবহনে চড়ে স্বামী আছাদুজ্জমানের সাথে ঢাকায় আসতেন। জীবনকে এভাবেই তৈরি করেছিলেন তিনি। অতিরিক্ত চাওয়া তাঁর ছিল না কখনই। বরং পার্টি কর্মীদের বিপদে-আপদে সংসারে নিজের জমানো টাকা দিয়ে দিয়েছেন।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। সে বছর ২৫ ডিসেম্বর জননেতা মরহুম মো. আছাদুজ্জামানের ২১ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মনোয়ারা জামানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করি। উনি তখন ঢাকাতে। বড় মেয়ে কামরুল লায়লা জলি এমপির সংসদ সদস্য ভবনের ৫ নম্বর ভবনের ২০২ নম্বর ফ্লাটে থাকেন। ১৬ ডিসেম্বরের আগে বাসাতে গেলাম সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য। মরহুম মো. আছাদুজ্জামানের রাজনৈতিক জীবন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মাগুরার বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, ছেলেমেয়দের নিয়ে নিজের জীবনযুদ্ধÑআরও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে বললেন তিনি।

প্রয়াত স্বামী মরহুম মো. আছাদুজামানের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, আছাদুজ্জামান সাহেব ছিলেন আপাদমস্তক এক সৎ রাজনীতিবিদ। ব্যক্তিগত সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিজের স্বার্থ নয় দলের স্বার্থকেই তিনি সবসময় অগ্রাধিকার দিতেন। ব্যক্তিগত সততা তাঁর মাঝে এতোটাই অটুট ছিল যে জিয়া-এরশাদের আমলে বিস্তর সুবিধার সুযোগ পেলেও তিনি তা প্রত্যাখান করেছেন।

তিনি আরও বললেন, আছাদ সাহেব ছিলেন গণমুখী এক নেতা। সাধারণ মানুষকে খুব ভালবাসতেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা ছিল অনেক উঁচুমানের। আর সবশেষে কোথাও বাধা পড়লে আমার পরামর্শ নিতেন।

বললেন, ‘আমার মনে আছে জিয়াউর রহমানের আমলে ৭৯ সালে আছাদুজ্জামান নির্বাচিত হওয়ার পর জিয়ার কাছ থেকে নানান ধরনের প্রলোভন আসতে থাকে। মন্ত্রীত্বের অফারও দেন। কিন্তু একদিন রাতে আমাকে বললেন, সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন কোনো কাজে তিনি কাউকে সহযোগিতা করবেন না।’

সেদিন মনোয়ারা জামান আরও জানান, ৮৬ সালে আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে প্রথম যে বক্তব্য পেশ করেন সেই বক্তব্যের ড্রাফট করার দায়িত্ব পড়ে আছাদুজ্জামানের উপর। সারারাত জেগে তিনি বক্তব্য ড্রাফট করেন। সকালবেলা নাস্তা সেরেই তিনি সেই লেখা বক্তব্য নিয়ে ধানমন্ডিতে যান শেখ হাসনিার কাছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মনোয়ারা জামানের দেখা হয়েছে বহুবার। বঙ্গবন্ধু কন্যার সাথে সবসময় আপন মেয়ের মতো কথা বলেছেন। ৮১ সালের ১৭ মে দেশে আসার পর সারাদেশে রাজনৈতিক সফর শুরু করেন শেখ হাসিনা। মাগুরাতেও রাজনৈতিক সমাবেশ করেন। সেসময় আছাদুজ্জামানের বাড়িতে যান। মনোয়ারা জামানের সাথে ছবিও তুলেন।

৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর অ্যাডভোকেট মো. আছাদুজ্জামানের মৃত্যু হলে ৯৪ সালের মার্চে মাগুরা ২ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা ঘটলে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা মাগুরাতে গিয়ে আছাদুজ্জামানের বাসভবনে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাবেন না বলে আন্দোলনে ঘোষণা দেন। সেদিন শেখ হাসিনার পাশে মনোয়ারা জামানও ছিলেন।

মনোয়ারা জামান বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। পিজি হাসপাতালের পর সর্বশেষ গ্রীণলাইফ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। সেখানেও দেখা হয় একবার। মৃদু হাসি দিয়ে সালাম গ্রহণ করেন। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পূর্বে তিনি নিজ বাড়িতে চলে যান। নিজবাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে মাগুরার জনগণ এক সত্যিকার ‘জননী’কে হারালো। আওয়ামী পরিবারের সদস্যরা হারালো তাদের ‘মমতাময়ী’ মাতাকে। এই শূন্যতা আওয়ামী পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও অপরাপর রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও সবসময় অনুভব করবেন।
জাহিদ রহমান: সম্পাদক, মাগুরা প্রতিদিন ডটকম

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2020
IT & Technical Support : BS Technology