আজ, বুধবার | ২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং | রাত ১০:৪৮

ব্রেকিং নিউজ :
শালিখায় দুস্থ শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন মাগুরায় শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে শিশু একাডেমির আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী মাগুরায় শেখ রাসেলের জন্মদিনে যুবলীগের পক্ষ থেকে শিশুদের জন্যে জরুরী ঔষধ ও খাবার বিতরণ মাগুরায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোস্টাল ইডি কর্মচারিদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ শেখ রাসেলের শুভ জন্মদিন মাগুরায় ৫৮৭ টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে মাগুরায় দুস্থ শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১০ কোটি টাকার স্বর্ণের বার উদ্ধার সুদে কারবারি মনিরুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিন কিশোর আটক মাগুরায় আদালতের নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি!

হারিয়ে যাচ্ছে মাগুরার আঞ্চলিক শব্দসমূহ

জাহিদ রহমান : সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য অঞ্চলের মতো মাগুরা অঞ্চল থেকে স্থানীয়ভাবে ব্যবহ্নত অনেক শব্দ হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। সেই পুরনো আমলের বা আমাদের ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত অনেক শব্দ এখন আর শুনতে পাওয়া যায় না। অনেক শব্দ আমরা দাদা-দাদী, নানা-নানী, মা-বাবার মুখে শুনলেও সেই সব শব্দগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠছে অজানা-অচেনা। সংস্কৃতি ও জীবনাচারে পরিবর্তন এবং বস্তুগত উন্নয়নের কারণেই মাগুরায় পূর্বে ব্যবহ্নত অনেক আঞ্চলিক শব্দেরই বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন শব্দ।

ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, অনরবত গ্রহণ বর্জনের মধ্যে দিয়ে ভাষা অগ্রসর হয়। অবশ্য এটি কালের নিয়মই বটে। আধুনিকায়ন এবং সামাজ রুপান্তরের কারণেই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত যোগাযোগের ব্যাপক উৎকর্ষের কারণেই অনেক শব্দ যেমন হারিয়ে গেছে তেমনি অনেক নতুন শব্দও যুক্ত হয়েছে। শিক্ষিতজন থেকে শুরু করে গাঁয়ের কৃষাণ-কৃষাণীও এখন তথ্যপ্রযুক্তির কারণে নতুন নতুন শব্দগুচ্ছকে বরণ করে নিয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকে ডিস সংস্কৃতি চালু হলে গ্রামে নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার বাড়তে থাকে। একইভাবে পরবর্তীতে মোবাইল যুগে অবাধ প্রবেশের পরে শুধু শহর নয়, গ্রামের মানুষের কাছেও প্রচুর নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার পরিচিত হয়ে উঠে। যেমন : অঁজপাড়া গায়ের কৃষাণী বা একজন চাষীর শব্দভান্ডার একসময় সীমিত হলেও মোবাইল আসার পর এখন ‘নেট’ শব্দটা খুবই পরিচিত। মোবাইল ফোনে কথা বলতে অসুবিধে হলে নিজেই বলে উঠেন ‘নেট’ পাচ্ছে না বা নেটে সমস্যা। এমন শব্দ চয়নেও এখন কারো সমস্যা হয় না।

একসময় আমাদের দাদা-দাদী-নানা-নানীসহ বয়োজ্যেষ্ঠদের চলাচল ছিল সীমিত। ফলে তাদের শব্দভান্ডারের পরিধি বা আকার ছিল খুবই ছোট। কিন্তু সেই দাদ-দাদী-নানা-নানীরাও এখন ফেসবুক, ইন্টারনেট শব্দ বুঝেন। গাঁও গ্রামের একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষটাও এসব শব্দের অর্থ বুঝেন। হালে চ্যানেল শব্দটা বুঝেন না-এমন লোক পাওয়া এখন মুশকিল। বর্তমান সময়ে গাঁয়ের মানুষের কাছেও মোবাইল, নেট, নেট কানেকশন, মেসেজ, মেসেসেঞ্জার, ফেসবুক, ফ্লেক্সিলোড, এমবি, ডাউনলোড, ব্লুট্রুথ, শেয়ার, ইমো, হোয়াটস অ্যাপ, বিকাশ, ভাইবার, জুম, ভিডিও, লাইভ সবই সহজবোধ্য। এ সব শব্দ এখন সবার মুখে মুখে। হালে লকডাউন শব্দটা এখন সবার কাছেই পরিচিত।

কালের বিবর্তনেই পুরাতন শব্দকে পেছনে ফেলে নতুন নতুন শব্দ জায়গা করে নিচ্ছে মানুষের মুখে। আগেই বলেছি এর অন্যতম কারণ বাহ্যিক পরিবর্তন এবং প্রযুক্তি ও যোগাযোগ শক্তির উন্মেষ। সাম্প্রতিককালে প্রযুক্তি আর যোগাযোগ কৌশলের পরিবর্তনের কারণেই যেনো নতুন এক ভাষার উদ্ভব হয়েছে। মানুষ নতুন যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন সেখানেই সে যোগাযোগ কৌশলে বেছে নিচ্ছে নতুন নতুন শব্দ।

পুরাতন অনেক শব্দ হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণটি হলো-শহরায়ন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক রুপান্তর। দেখা যাচ্ছে গ্রামে ব্যাহিকগত নানা ধরনের পরিবর্তনের ফলে আসবাবপত্রসহ বাড়িতে ব্যবহার্য অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। ফলে সেই নামগুলো ব্যবহার না হতে হতে হারিয়ে গেছে বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন ঘরবাড়ির কথাই ধরা যাক। একসময় গ্রামে ছিল মাটি ও ছনের তৈরি ঘর। কিন্তু এগুলো এখন বিলুপ্ত। সবখানেই এখন আধাপাকা বা পাকা বাড়ি। এই ঘর-বাড়ি কেন্দ্রীক কিছু শব্দের ব্যবহার ছিল গ্রামগুলোতে। আবার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেভাবে রাখা হত সেখানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেই আগের মতো করে রাখা হয়না। এখন গ্রামেও সিলিন্ডার গ্যাসে রান্না-বান্না হয়। ফলে এখানেও শব্দ ব্যবহারে পরিবর্তন এসেছে।

একইভাবে কিছু পেশা-প্রথাতেও পরিবর্তনের কারণে পুরনো শব্দগুলো হারিয়ে গেছে, বা তেমন একটা শোনাও যায় না। হারিয়ে যাওয়া শব্দ খুঁজতে গিয়ে নিন্মোক্ত শব্দগুলোর খোঁজ পেয়েছি। তবে নিশ্চিত এর বাইরে আরও অনেক শব্দ রয়েছে যেগুলোর ব্যবহার নেই বললেই চলে।

মাগুরা অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া বহুল ব্যবহ্নত শব্দের একটি তালিকা (উচ্চারণ অনুযায়ী) এখানে উল্লেখ করা হলো।
স্থান সংক্রান্ত শব্দ: পালান, দুয়াল, দোপ, দোপা, পগাড়, মেটেল, হালট, নালা, পাওরি, কুম (বড় গর্ত), ডোবা, আড়া, গাড়া, জিয়ালা, পৈয়াম (সরু নালা), কানদি, কুয়ো, চাকলা, সিথেন (বিছানা)।

ঘর-বাড়ি সংক্রান্ত শব্দ: হাতনে, পতনে, ডুয়া, খুটি, লেপা, আড়া, ডাসা, হুড়ক্,ো খোপ, চাঙ, চড়াট, খিল, বাটাম, রুয়ো, চৌকি, জলচৌকি, ডাফ, কানছি (ঘরের পেছনে)।
কৃষি ও চাষবাস সংক্রান্ত: গোয়ারা, টেঙি, আচড়া, বেশই, মাথাল, টোনা, পাতো, ডেলা, কেন্দর, মলন, ঢেঁকি, চড়–ম, নোট (চিঁড়ে কোটার), খেটে, পাটসারা (ধান গোছানো হয়), জাব, গাদা (একসাথে), পালা (খড়ের পালা), বিচেলি (খড়), নাড়া (খড়), মশনে, মেস্তা, কাউন, ভুড়ো, বেছন, আগরা, আস্টেল, ভাটি, কুষ্টা।

জিনিসপত্র রাখা বা পাত্র সংক্রান্ত শব্দ: ছিয়ে, অ্যাংলে (কাপড় রাখার জন্য ঝুলিয়ে রাখা তক্তা), মাচা, জালা, কোলা, খুটি, ঘট, মালশা, ঢাকুন, আদলা, ঘটি, সানকি, শরপেশ, চালন, ডোল, আউরি, ধামা, কাঠা, সের, খলুই, জের, ঠিলে, মটকা, ঝেঁঝোর, ডগি, কেইড়ে, বোচকা (জিনিসপত্রের ব্যাগ), টুপলা।

রান্নার কাজে ব্যবহ্নত জিনিস সংক্রান্ত শব্দ: ডেকচি, খাপরি, পেলে (পাতিল), হাতা (চামচ), অরোং, নাওরি, থাল, চালন, কুলা, পাটা, পুতো, আছাড়ি, ঘুটে, আহা (চুলা), ঝিক (মাটির চুলার সরু মাথা), খুচানি, কুড়ানি, উপো (ফুঁ দেওয়ার যন্ত্র),

খাবার সংক্রান্ত শব্দ: ছালুন (তরকারি), জাউ, ধাপড়া, দলো, ছিন্নী, উরুম (মুড়ি), বজা (মাছের ডিম), পিছা (মাছের অংশ বিশেষ), কুশোর (আখ), গুয়ো (সুপারি), থোড় (কলাগাছের ভেতরের অংশ), খুদ ( চাউলে ভাঙা অংশ), ফ্যান (ভাতের মাড়)।

বাড়িতে ব্যবহারের জিনিস সংক্রান্ত শব্দ: শলা, গোঁজ, হেরিকেন, চিমনি, সলতে, পলতে, যাতা, গারু, ফিড়ে, সাজি।

দেশীয় অস্ত্র সংক্রান্ত: যুঁতি, এঁরা, কোঁচ, থোরকোঁচ, ছ্যান, ভেলা, শড়কি, উড়ো, ঢাল, ছেনি, বর্শা, ড্যাগার।

নৌকা ও মাছ ধরার যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত: ঘুনি, দুয়ারি, বানা, উছা, হ্যাচাক, লগি, বৈঠা, চরাট, ডাওত, গলুই, গুন, পাটাতন, ছই, পাল, ডুঙা, পেনেট ( চটা পানিতে ভিজিয়ে রেখে করা হয়), হাইল।

অন্যান্য শব্দ: ছুরানি, লেম্ফো, কুপি, ডলক (বৃষ্টি), জার (শীত), কাঁচড়া (কাঁচা), ভাড়াসে (অসময়ে), বাসনা, কারা (হাটে কারা দেওয়া), বীরে (মাথায় কোনো ভারি বোঝা বা বস্তু নেওয়ার আগে যেটা ব্যবহার করা হয়), কোচ, তবিল, হাবড়, নিজেল, ঝিনে, আহালি (চাউলের মধ্যে যেটা খাবারের অযোগ্য শক্ত বস্তু বিশেষ), মালগোছা (বিশেষ কায়দায় লুঙি কোমড়ের সাথে বাধা), দরাম (জোরে), ফস (তাড়াতাড়ি), ফাঁসা ( জানালা, বেড়া বা হাতের ফাঁক), জিয়াফত (দাওয়াত খাওয়া), ফসাৎ (হঠাৎ), নাওয়া (গোসল), ডাক (বজ্রপাতের শব্দ), আবলোস (বোকা), চাটাম ( বেশি করে বলা), হিয়েল/ ইয়েল ( কুয়াশা), ওজোর (জেদ), ফোরন ( কথার মধ্যে কথা বলা কাটা), ভরো ( পিছিয়ে পড়া গ্রাম), গফাৎ ( হঠাৎ পড়ে যাওয়া), অশোলে (বিরক্তি কথা), শলক (সকাল), এঁটে (অপরিস্কার হাত), রুল (লাঠি), হাউস (শখ) আঁচা ( নারকেলের আঁচা), হাবু (গোসল), আললে (লবণহীন তরকারি), আঁশটেল (এক ধরনের কচ্ছপ), ঝুল (ঘরের ময়লা), ছ্যামা (ছায়া), আজাড়ে (অমূলক), আবাইতে ( দ্রুত খাওয়া), হাবলা (বোকা), ঢল (বৃষ্টি), আজদাহা (আজদাহা টাইপের মেয়ে), আটাচালা (চালন), আটালু (গরুর গায়ে থাকা পোকা), আটো (ছোট ঘর, চেপে ধরা পোশাক), আটখুড়ো (যার সন্তান নেই), এঁরো (বাঁকা কথা), কান্টে ( যে ঝগড়া করে), আড় (কাপড় শুকানোর জন্য টানানো বাঁশ), কাতিকুতু (কুতু দেওয়া, হাসানো), আধলা (অর্ধেক), আদার (বড়শির টোপ), সেয়ানা (বয়স্ক ছেলে-মেয়ে), কোচ (কামিজ বা লুঙিতে কিছু রাখার কৌশল), আনা (এক আনা, দুই আনা), নুন (লবণ), ছ্যাপ (থুথু), ফায়না (শখ), আইরপথ (অন্যপথ), আলোপাতা (তামাকপাতা), গচি (ছোট বাইন), ইচা ( চিংড়ি মাছ), ইট্টুজালা (ছোট), ঈষ (লাঙলের অংশ), উদা (নরম হয়ে গেছে)।

ইট্টু (ছোট), বলগ (ভাতে গরম হওয়া), আন্ধাররাইত (মধ্যরাত্রি), ক্ষার (জামা-কাপড় পরিস্কার করা), ব্যালক (সংসারে আলাদা হওয়া), বাটকে (খাটো), দর (গত করা), নেতি (নরম কাদা), ঠিসে (পিপাসা), আতর (জমির চাষের পরিমাণ), খুপি (গোপন ছোট জায়গা), মিতে (বন্ধু), খিজি/খিজালত (যন্ত্রণা করা), কল (টিউবওয়েল), চ্যাঙা (ছোট ডালের লাঠি বিশেষ), কিলিক (ষড়যন্ত্রকারী), চুঙো, ঠুসি, জুঁত (ঠিকমতো), চাড়া, চাবলা, চেলে, কাঁকর (বাঙি), খ্যাতা (কাথা), খাবলা (এক মুঠ), গবদা (মোটা), টাটি (টয়লেট), ফুলো (অপরিপক্ক), উলোফা (বাজে কথা), উয়ালে (আবর্জনা), শান ( ইটের মেঝে), মুথা ( গাছের গোড়া), উবধো (নিচু হয়ে দেখা)।

কাববি (রগড়), বুকতা (অকার্যকর), কতকত (দ্রুত), কচা (কেউ ক্ষতি করবে এমন), কটাশ (কামড়ে খাওয়া), কটকটে (মুখে মুখে কথা বলে যে), করাৎ (দ্রুত কিছু করা), কাইমাই (ঝগড়াঝাটি), কামকুম (কাজ সারা), কামানো ( ক্ষৌরিকর্ম), জিবুত (কমবয়সী ছেলেমেয়ে), উজ্জ্বতি (ঝগড়া করা), পিল্লামেনে (দেখতে বড়), ভরাপড়া (ক্ষতি করতে এসেছে এমন কেউ), উদবেশে (অস্থির লোক), গিরিফিনটি (কথিত বুদ্ধিমান), কুয়ে (পচা, জটিল), ক্যাতরা (দুর্বল), ভরো (গ্রাম্য), ফ্যাদা (অতিরিক্ত কথা), ক্যাটাং ( হাস্যরস করা) ।

জাহিদ রহমান: সম্পাদক, মাগুরা প্রতিদিন

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2020
IT & Technical Support : BS Technology