আজ, রবিবার | ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং | বিকাল ৪:৪৬

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরায় দেওয়াল চাপায় ২ নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে মাগুরায় যুবলীগের ৪ দিনের কর্মসূচি নারীরাও পুরষের মতোই স্বাধীনতা, বিপ্লব, সশস্ত্র যুদ্ধের যোগ্যতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে-জাসদ নেতা জাহিদুল আলম মাগুরায় হাজিপুর ইউনিয়ন জাসদের কমিটি গঠন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় চৌবাড়িয়া গ্রামে ভেলা বাইচ উত্সব রান্না ভালো না হওয়ায় মহম্মদপুরে বড় ভাইয়ের আঘাতে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু দুর্গাপূজা উপলক্ষে শ্রীপুরে অনুদানের চেক ও নগদ অর্থ বিতরণ শ্রীপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বঙ্গবন্ধুর ম্যূরাল উদ্বোধন শ্রীপুরে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ মাগুরায় সুপ্রভাত বাংলাদেশের তালবীজ রোপন কর্মসূচির উদ্বোধন

ভালোবাসার মাগুরা

অনন্যা হক : রেখে এসেছি কৈশোর সেই চোরাকাঁটার মাঠে।মাঠের ধারে পুকুর ঘাটে। রেখে এসেছি যৌবনের সেই অনুসন্ধিত্সু মন প্রিয় শহরের পথের বাঁকে। কৈশোরের উত্তাল চলার ভঙ্গীতে তখন বুঝিনি কোন কিশোরের চোখের ভাষা। যৌবনে পথ চলতে চলতে দেখেছি কত যুবকের মুগ্ধ চাহনি। বেড়ে উঠেছি প্রিয় ছোট শহরে যদিও অনেক বিধিনিষেধের বেড়াজালে তবুও প্রজাপতির রঙ মেখেছি, ঘাস ফড়িং এর পেছনে ছুটেছি, মেঘের সাথে স্বপ্নে উড়েছি, বৃষ্টিভেজা সোঁদা মাটির গন্ধ পেয়ে শেকড়ের টান অনুভব করেছি।

ছোট শহর মাগুরা। যার অলি গলি, আনাচে কানাচে এঁকে রেখেছি অসংখ্য পদচিহ্ন। মনে করতে গেলে স্মৃতির ডালি উপচে পড়ে। আমার প্রিয় ও প্রাণের শহর মাগুরা।জন্মস্থান, বেড়ে ওঠার জায়গার সাথে থাকে এক আজন্ম টান, শেকড়ের টান। যেন রক্তের সাথে মিশে থাকা এক তীব্র অনুভব। কাছের লোকের প্রতি মানুষের যেমন টান থাকে থাকে নিজের শহরের প্রতিও তেমন আকর্ষণ এবং আবেগ। ঐ শহরের মাটির কাছে আমি ঋণি, আলোর কাছে, বাতাসের কাছে, গাছ পালা আকাশ রোদ্র বৃষ্টির কাছে আমি ঋণি।

পাখির কলতানে মুখরিত সেই ভোর এক মায়াবী ছোঁয়ায় মনে ফিরে আসে।মনে পড়ে অলস দুপুরে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ে পার করা সময়ের দিনগুলোর কথা। বিকেলে বন্ধুদের সাথে খেলার সেই অদম্য ছুটোছুটির মধুর সময়ের কথা। পার করে এসেছি সে সময় কিন্ত সময় গুলো আটকে আছে ঐ শহরের বুকেই। নিজের শৈশব কৈশোর যৌবনের দিনগুলো শহরের বুকেই থমকে আছে।তাই দূরে থেকেও এক অমোঘ ভালোবাসার মোহে টানতে থাকে সে শহর।

সন্ধ্যায় বাড়ির সিঁড়িতে বসে দেখেছি কত অগণিত দিন সারি সারি উড়ে চলা বাদুড়ের ঘরে ফেরা। নিজের শহরের আকাশে উড়ে চলা পাখিটিও যেন নিজের আপন মনে হয়। যে সব স্বাদ দীর্ঘদিন অন্য কোন শহরে থাকলেও অনুভবে আসে না।

হাসবেন্ডের চাকরীর সুবাদে সারা দেশ ঘুরেছি। দেখেছি অনেক সুন্দর সুন্দর শহর। কিন্ত যেখানেই থাকি নিজের শহরের সাথে থাকে আপন নিবীড় সম্পর্ক সে জড় হয়েও প্রাণে প্রাণে যেন কথা বলে যায়। সে শহরের আঁকাবাঁকা পথ গুলো মানসপটে এঁকে বসে আছে। ছবির মতো দেখতে পাই, পথের ধারের বুনো ফুল গুলো। দেখতে পাই বড় রাস্তার ধারের কালের সাক্ষী বড় গাছ গুলোকে,যার ছায়ায় হেঁটেছি কত। কৃষ্ণচূড়া রাঁধাচূড়া জারুল শিমুল পলাশফুলের গাছ গুলো সেই জন্ম অবধি ফুলে ফুলে রাঙিয়ে যাচ্ছে শহরটাকে। নিজের শহর বলেই সব যেন একটা পাকা আসন করে নিয়েছে মনের ভেতরে।ভোলা যায় না কিছুই।

রাস্তার দু ধারে সাজানো আছে অগণিত দোকান পসরা,পরিচিত অপরিচিত লোকের সমাগম। পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে দাঁড়িয়ে কথা বিনিময় সব যেন আন্তরিকতার এক অন্যরকম প্রকাশ। ভালো লাগে চা এর দোকানের জটলা। ওখানকার স্কুল কলেজ সব আমাদের কোলাহল আর পদচারণার চিহ্ন ধারণ করে রেখেছে। পথ গুলো ধারণ করে রেখেছে আমাদের ভাবনা আর কথোপকথন তার বুকে। এ সব ভালোবাসার চিহ্ন মুছে যাবে না কোনকালেও।

বেড়ে উঠেছি অভিভাবক টিচারদের ছত্রছায়ায় কখনো শাসনে কখনো স্নেহ মমতায়। যাদেরবেশীর ভাগই পরপারে চিরতরে পাড়ি জমিয়েছেন। সব কিছুর সাথেই আছে অসংখ্য স্মৃতি আর মায়ার বন্ধন।

যখন আমরা বড় হয়েছি এই জেলা শহর মাগুরা তখন ছিল ছোট এক পরিচ্ছন্ন নিরিবিলি শহর। আমরা চিনতাম শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত অনেকটা যেনসকলকেই। অসম্ভবআন্তরিকতার এক মেলবন্ধনে আবদ্ধ ছিলো সব পরিবার এবং মানুষ গুলো। ছিলো এক জমজমাট পরিবেশ। আনন্দ বিনোদন আড্ডার এক ভিন্ন প্রাণ সঞ্চারিত হতো সবার মনে। আমরা দেখেছি আতিথেয়তা আপ্যায়নের এক সুন্দর পরিবেশ যা কিনা মনে দাগ কেটে আছে আগের মতোই। এখন যদিও শহরে সেই নিরিবিলি পরিবেশ আর নেই। অনেক লোক আশেপাশের গ্রাম থেকে এসে বসতি স্থাপন করে এখন হয়েছে এক ঘনবসতিপূর্ণ শহর। আগের সেই পরিবেশ না পেলেও নিজ শহর একই আপন মহিমায় উজ্জ্বল থাকে হৃদয়ে। ঠিকই একই আবেগ আর ভালোবাসায় টানতে থাকে।

আজ ছয় মাস হলো চলছে এক বিভীষিকাময় সময়।করোনার ভয়াবহ থাবায় মানুষের মন জীবন বিপর্যস্ত। করোনা মানুষকে ঘরবন্দী অসামাজিক হতে বাধ্য করেছে। ইচ্ছে হলেই স্বাধীন মতো বাইরে যাওয়ার দরজা রুদ্ধ করেছে।তাই ছুটে যাওয়া হয়নি নিজের শহরে। কতদিন স্পর্শ করিনি নিজ শহরের মাটি। যেতে প্রতিবন্ধকতা বলেই শহর যেন আরো বেশী করে টানছে।

শহরের প্রতি ভালোবাসার আকর্ষণ, শহরের আত্মীয় পরিজন বন্ধুদের প্রতি টান আরো গভীর ভাবে অনুভূত হচ্ছে। আসলে শেকড়ের টান নীরবে রক্তস্রোতের ভেতরে কথা বলে। শেকড়টা তো নিজ শহরেই পোতা থাকে। ঐ শহরের সবুজে মায়া, মাটিতে মায়া, আকাশের এক ফালি রোদও যেন চির চেনা। তাই জড় হয়েও নিজ শহর হয়ে থাকে এক প্রাণবন্ত ভালোবাসার আধার। মাগুরা আমার শহর, মাগুরা আমাদের শহর। আমাদের ভালোবাসায় সমুজ্জ্বল এক শহর। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি কবে স্পর্শ করতে পারবো আপন শহরের সেই মাটি। আমাদের ভালওবাসার শহর আবার সুস্থ হয়ে উঠুক, আমাদের অবাধ চলাচলের যোগ্য হয়ে উঠুক, এটাই নিরন্তর কামনা করছি। ভালোবাসার শহর মাগুরা, ভালোবাসি মাগুরা!
অনন্যা হক: কবি, লেখিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2020
IT & Technical Support : BS Technology