আজ, সোমবার | ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং | রাত ৮:০২

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা ও বৃক্ষরোপন মাগুরায় কোভিড-১৯ নমূনা পরীক্ষা ল্যাবের উদ্বোধন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মাগুরার ছোটন-চায়না দম্পতি খুন মাগুরায় দেওয়াল চাপায় ২ নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে মাগুরায় যুবলীগের ৪ দিনের কর্মসূচি নারীরাও পুরষের মতোই স্বাধীনতা, বিপ্লব, সশস্ত্র যুদ্ধের যোগ্যতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে-জাসদ নেতা জাহিদুল আলম মাগুরায় হাজিপুর ইউনিয়ন জাসদের কমিটি গঠন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় চৌবাড়িয়া গ্রামে ভেলা বাইচ উত্সব রান্না ভালো না হওয়ায় মহম্মদপুরে বড় ভাইয়ের আঘাতে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু দুর্গাপূজা উপলক্ষে শ্রীপুরে অনুদানের চেক ও নগদ অর্থ বিতরণ
স্মৃতিময় প্রিয় নবগঙ্গা

স্মৃতিময় প্রিয় নবগঙ্গা

সুলতানা কাকলি : কদিন আগের কথা। মুক্ত বাতাসে একটু নিঃশ্বাস নেবার জন্য আমার জন্মভূমি মাগুরার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রিয় নবগঙ্গার তীরে বিকালে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘর থেকে বেরুনোর সময় ভেবেছিলাম এ সময়ে নদী একদম টইটুম্বুর হবে,  স্রোত থাকবে, পালতোলা নৌকাও থাকবে। শৈশব, কৈশোরের দেখা নদীর সেই রুপের সাথে বর্তমান রুপের কিছুটা সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে নয়ন মন কে সার্থক করবো। কিন্তু আমার সে আশায় গুড়েবালির মতো অবস্থা হলো। মনটা বিষন্ন হয়ে গেল-সেই নবগঙ্গা আর নেই বলে!

শৈশবে দেখা সেই প্রমত্তা নবগঙ্গার চেহারা ছবির মতো ভেসে উঠলো মনে। তখন নদীটি ছিল অনেক চওড়া ও বিস্তীর্ণ। নদীতে ছিল পানি আর পানি।

এখন প্রতিদিন সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতে যখন তখন বেশ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি পড়ার শব্দে মনের মাঝে এক রিনিঝিনি ছন্দের ঢেউ খেলে যায়। এতো বৃষ্টি! অথচ নদীতে নেই তেমন পানির কল কল গুঞ্জরন। সেই চওড়া রুপময় নদীটা এই ভরা বর্ষায় আজও রুগ্ন। নদীতে নেই স্রোত, নেই ঢেউ-মনে হয় নবগঙ্গা যেন নিস্তরঙ্গ এক দিঘীর মতো।

ছোটবেলায় শহরের ওপারে পারনান্দুয়ালী খালা বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সময় যখন খেয়াঘাটে এসে দাঁড়াতাম তখন দেখেছি নবগঙ্গা নদীর স্নিগ্ধ ঢেউ আর দুর্বার স্রোত। বড় বড় পালতোলা মহাজনি নৌকা, যাত্রী পারাপারের নৌকাসহ গুন টানা নৌকাও দেখেছি। আরো দেখেছি নদীতে লঞ্চ চলাচল করতে। স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া কচুরিপানাগুলো ভাসতে ভাসতে কোন সূদুরে মিলিয়ে যেতো। মাঝে মাঝে মাঝ নদীতে বড় বড় শুশুক (স্থানীয় ভাবে  শিশু বলা হয়) হঠাত্ করে ভেসে উঠে টুপ করে আবার ডুবে যেতে দেখেছি। আবার খেয়াঘাটে মানুষের ওপারে যাওয়া আর ওপারের মানুষের এপারে আসার তাড়া সব সময় লেগেই থাকতো। দু’পারের মানুষের কর্ম ব্যস্ততা ও হাকডাকে মুখরিত থাকতো খেয়াঘাটটি। ঘাটে বসে আমরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন খেয়া নৌকায় উঠে ওপারে যাবো। অপেক্ষার প্রহর যেন কিছুতেই শেষ হতো না। আজকে সেই খেয়াঘাট আর নেই শুধু কঙ্কালের মতো চিহ্ন রয়ে গেছে। দুপারের তীর ঘেসে অসংখ্য ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। নদীর যে চিরায়ত রুপ তা আর নেই।

ওপারের এক বাড়ির কোল ঘেসে ছোট্ট একটা ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেলাম। নবগঙ্গায় নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন, নেই মানুষের কোলাহল। কালের বিবর্তনে নদী আজ হারিয়েছে তার যৌবন। আগেই বলেছি এই নদীতেই চলাচল করতো কতো বড় বড় পালতোলা মহাজনি নৌকা। সব এসে বাজারঘাটে নোঙর ফেলতো। আর ঐ ঘাটে সূদুর খুলনা হতে নড়াইল ও শত্রুজিতপুর হয়ে বাজারঘাটে এসে লঞ্চও ভিড়তো। মহাজনী নৌকায় আসতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিসপত্র। সেই সাথে সুন্দরবন থেকে আসতো গেওয়া, গরান, সুন্দরী কাঠ ও গোলপাতা। ঐ বাজারঘাটে ব্যবসায়িদের পণ্যসমুহ খালাস করে এই খেয়াঘাটে এসে মহাজনী নৌকা গুলো যাত্রা বিরতি দিয়ে শ্রীপুরের দিকে চলে যেতো। ঐ নৌকা গুলো নদীপথ বেয়ে দূর-বহুদূরে অন্য কোনো জেলায় অন্য কোনো ঘাটে আবার দাঁড়াতো তাদের পণ্য নিয়ে। সারা বছর চলতো নিত্য তাদের আসা যাওয়া। আহা! কি অপুর্ব ছিল শৈশবের সেই সোনালী অতীত। দুরদুরান্ত থেকে আবার ঝাঁক বেধে হঠাত্ করে আসতো বেদে নৌকার বহর। নৌকার উপরই চলতো তাদের জীবনসংসার। সকাল হলেই বেদেনীরা সারা শহরের পাড়া ও মহল্লায় ঝাঁপিতে বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বিক্রি করে বেড়াতো। তাদের কাছ থেকে আমরা কত যে রংবেরং  চুড়ি, মালা ও চুলের ফিতা কিনেছি তার ইয়ত্বা নেই। কোনো কোনো বেদেনী বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় চিত্কার করে বলতো, ‘দাঁত খসাই, পোঁকা, খসাই, বিষ খসাই, বাত সারাই।’ যেখানে যেখানে ব্যথা হতো তারা সেখানে শিঙা লাগিয়ে চুষে বিষরক্ত বের করে দিতো।

ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নগর ও সভ্যতা। অথচ আজ আধুনিক জীবনের গতিধারায় পাল্টে গেছে সব কিছু। নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা নগর হয়েছে আরো স্ফীত, বর্ধিত, দৃষ্টিনন্দন। অথচ সেই প্রমত্তা যৌবনবতী নদী আজ মৃত প্রায়। দুপাড় ভেঙ্গে ভাঙ্গা চোয়াল ও রুগ্ন জীর্ণ শরীর নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে। আরো দুঃখের বিষয় এই যে, নদীখেকো মানুষগুলো নদী ভরাট করে গড়ে তুলছে সুরম্য দালানকোঠা ও কলকারখানা। বিভিন্ন বর্জতে নদীর পানি হচ্ছে দুষিত। পানির বিষাক্ত গন্ধে বাতাস দুষিত হয়ে মানবজীবন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। নানারকম রোগব্যাধিতে শিশু, যুবা, বৃদ্ধ সবাই হচ্ছে আক্রান্ত।

প্রিয় নবগঙ্গার দিকে তাকিয়ে এখনও একটু স্বস্তি পাই। এখনো তার অন্য নদীর মতো অতোটা জীর্ণ শীর্ণ দশা হয়নি, তবে দাঁত পড়া বৃদ্ধের মতো অবস্থা এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা মানুষেরা বৃদ্ধ হলেও কতো যে পরিচর্যা করি তা বলে শেষ করা যাবে না। মুখের বলিরেখা ঢাকার জন্য নানান রকম কসরত করি। কেউ বিউটি পার্লারে ফেসিয়াল করতে যায়, কেউ বাড়িতে মুখে টমাটো, শশা, লেবু এবং আরো কতকি দিয়ে মুখের বলি রেখা ঢাকার চেষ্টা করে। পাকা চুলে কলপ করে বয়স ঢাকার চেষ্টা করে। কিন্তু একদিন সবাইকে সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। অন্ধকার কবর হয় শেষ ঠিকানা। সমস্ত রুপচর্চা বৃথা হয়ে যায়।

নদীর জীবনও কি মানুষের মতো? সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে তারও কি পৃথিবী হতে বিদায় নিতে হয়? তাতো হবার কথা নয়! মানুষের কল্যাণের জন্যই নদীর সৃষ্টি। মানুষ যতদিন থাকবে, জীবন যতদিন থাকবে, নদীও তার নাব্যতা ও ফল্গু ধারা নিয়ে এ পৃথিবীতে বিরাজ করবে। স্রোতোস্বীনি নদীর বুকে পালতোলা মহাজনি নৌকা ও নদীর অন্যান্য জলযান নিত্য আসা-যাওয়া করবে। মাঝি মাল্লার সুমিষ্ট গানের সুর প্রকৃতির বুক চিরে আমাদের কানে ভেসে আসবে। কচুরিপানা গুলো স্রোতের টানে ভেসে যাবে কোন সূদুরে। হঠা্ত্ হঠাত্ নদীর মাঝ থেকে শুশুক ভুস করে ভেসে উঠবে তাই দেখে বাচ্চারা আনন্দে হৈ হৈ করবে। নদীর এ রকমই পৃথিবীতে থাকার কথা, জীবনের মতো বিদায় নেবার কথা নয়। কিন্তু নদী মানুষখেকোদের অত্যাচারে হারিয়ে যাচ্ছে।

মন খারাপ করে খেয়াঘাট ছেড়ে অনতিদূরে বাজার ঘাটে আসলাম। যেহেতু নদীপথের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে সেহেতু বাজারঘাট আর নেই। তার স্থলে মাগুরা ও পারনান্দুয়ালীর মধ্যে যোগাযোগ এর জন্য মনোরম এবং অপুর্ব একটি সেতু তৈরি হয়েছে। এই সেতুটি যেন দুই পারের মানুষের মেলার বন্ধন। এখানে নারী, পুরুষ, বাচ্চারা একটু বিনোদনের আশায় বিকালে বেড়াতে আসে। এখানে বাদাম ভাজা, ফুচকা, চটপটি সব পাওয়া যায়। আমি অনেক মানুষের ভিড়ে মিশে সেতুর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলাম, মানুষের মতো নদীরও বড় বেশি পরিচর্যা, যত্ন প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষায় খুব জরুরী প্রয়োজন এটি। নইলে প্রিয় নবগঙ্গাও একদিন সত্যিই হারিয়ে যাবে।
সুলতানা কাকলি: লেখিকা, সাবেক গার্লসগাইড, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, মাগুরা।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2020
IT & Technical Support : BS Technology