আজ, শুক্রবার | ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং | বিকাল ৫:০০

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরায় বারাশিয়া গ্রামের অবৈধ ব্যাটারি কারখানা সিলগালা মাগুরায় “সাইবার নিরাপত্তা ও আমাদের ভবিষ্যত্”শীর্ষক সেমিনার সফল করোনাযোদ্ধা হিসেবে মানবাধিকার পুরস্কার পেলেন শ্রীপুর থানার ওসি সরকারি নিবন্ধনের অনুমোদন পেলো ‘মাগুরা প্রতিদিন ডটকম’ মাগুরায় হামলা-পালটা হামলার ঘটনায় এড. কল্লোলসহ ৪২ জনের নামে মামলা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে ফতোয়াবাজির প্রতিবাদে মাগুরায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের মানববন্ধন মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে মসজিদের সামনেই ভাস্কর্য! মাগুরাবাসি আবার পাচ্ছে রেডক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান মাগুরায় জেলা কৃষকলীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত মাগুরায় এনজিওর পক্ষ থেকে ৩৪৮ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মধ্যে খাদ্য সামগ্রি বিতরণ
শাপলা বিক্রেতা সুকুমার বিশ্বাসের জীবনের গল্প

শাপলা বিক্রেতা সুকুমার বিশ্বাসের জীবনের গল্প

সুলতানা কাকলি : জীবনের এই রঙ্গমঞ্চে প্রতিটি মানুষ এক সময় তাঁর জীবনের পালাগান শেষ করে পৃথিবী হতে বিদায় নিয়ে পরপারের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। জীবন চক্রের অমোঘ এই নিয়মের ভিতরে আমরা বন্দী সবাই। তবুও এই ক্ষণিকের দুনিয়ায় ভাল ভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে প্রতিটি মানুষ জীবনকে সুন্দর থেকে সুন্দর তরো করে গড়ে তোলার অনেক স্বপ্ন দেখে। আকাঙ্খা ও স্বপ্ন পূরণের জন্য শৈশব থেকেই নানাবিধ পরিশ্রম করে। জীবনের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কতইনা পরিশ্রম করতে হয়।

কেউ ব্যবসা- বাণিজ্য করে,কেউবা দেশের শিক্ষা শেষ করে পাড়ি জমায় বিদেশে আরো বড় ডিগ্রি নেবার জন্য, যাতে করে নিজের জীবনটাকে সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যে গড়ে তোলা যায়। যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার কিংবা লেখা পড়ার সামর্থ নাই তারাও কাঁয়িক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবনের চাঁকাকে সচল করতে চায়।আমাদের দেশের আনাচে কানাচে এমন অসংখ্য মানুষ আছে যারা আজও শিক্ষার আলো চোখে দেখে নাই, জন্ম লগ্ন থেকেই দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, তবুও তাঁরা বাচার তাগিদে কেউ বাদাম বিক্রি করে, কেউ আখের রস বিক্রি করে, কেউ ঝাঁলমুড়ি বিক্রি করে, কেউ রিক্সা চালায়, বিভিন্ন রকমের কাঁয়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে তাঁদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। এটাই হয়তো বিধির বিধান। কেউ লাখ টাকা উপার্জন করে বিশাল অট্টালিকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করে আবার কেউ পান্তা খেয়ে, ছেড়া পাটিতে শুয়ে ও ফাটা বালিসে মাথা গুজে রাত্রিযাপন করে।

খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল। মুখে ব্রাশ গুজে ছাঁদে পায়চারী করছি। হঠাত্ শোনা গেল শৈশবের সেই পরিচিত মানুষটির গলা, শা-প-লা নে-বে-ন শাপলা।

চিরাচরিত নিয়মে ভোর বেলায় বস্তা ভর্তি শাপলা, কলমি শাক আর কলার মোচা নিয়ে হাঁক ছেড়ে প্রতিদিন শহরের প্রতিটি মহল্লায় বিক্রি করে বেড়াত। শৈশব-কৈশর এবং যৌবনের সন্ধিঃক্ষণে প্রতিদিন তাকে দেখেছি। শীত, গ্রীষ্ম বর্ষার দিনেও তাঁকে কলমি শাকের বোঝা নিয়ে বিক্রি করার জন্য ঘুরতে দেখেছি। জীবন চলার পরিক্রমায় নিজ জেলা শহর ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় আমাকে থাকতে হয়েছে। ওই মানুষটির কথা সময়ের বিবর্তনে ভুলেই গিয়েছি।

দীর্ঘদিন পর আবার ফিরে এসেছি নিজ শহরে। হঠাত্ ওই পরিচিত মানুষটির কণ্ঠ শুনে ওঁকে জানার জন্য মনে খুব কৌতুহল হলো। শাপলা কেনার ছলে তাঁকে আমি বাসায় ডেকে নিলাম। তিরিশ বছর আগে যেমন দেখেছি অবিকল তেমনই আছে।

বয়সের পরিবর্তন ছাড়া চেহারা ও স্বাস্থ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। বস্তা মাথায় করে তিন তলায় উঠে হাঁপিয়ে গেল। বস্তাটা টান দিয়ে দরজার সামনে ফেলে বসে পড়লো। বোঝা গেল খুব ক্লান্ত। পিরিচে করে কটা বিস্কুট দিলাম খেয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষের মুখটি দেখে দরদাম ছাড়াই দুআটি শাপলা কিনে নিলাম। সেই সাথে তাঁর জীবনের গল্প জানতে চাইলাম।

তাঁর নাম সুকুমার বিশ্বাস। বাড়ী শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়া গ্রামে মাদ্রাসার কাছে। হতদরিদ্র মালো সম্প্রদায়ে তাঁর জন্ম হয়। বাবার নাম মাখন লাল বিশ্বাস। দারিদ্র্যতার জন্য মাত্র দশ বছর বয়স থেকে জীবন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। ওইটুকু বয়সে সে আগের দিন বিভিন্ন খাল-বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে পরদিন সকালে না খেয়ে সে-ই কাকডাকা ভোরে খামারপাড়া গ্রাম থেকে মাগুরা শহরে বিক্রি করতে আসত। সে আমলে যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকলেও বাধ্য হয়ে পেটের তাগিদে হেটে মাগুরায় এসে শাপলা বিক্রি করত। শাপলার সিজন শেষ হলে, কলার মোচা, কলমি শাক, কখনও মাছ মাথায় করে এনে মাগুরাতে এসে এগুলো বিক্রি করে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরতো। এভাবেই কেটে গেল তাঁর সত্তরটি বসন্ত।

নিজের কষ্টার্জিত অর্থে সংসার চালিয়ে দিনাতিপাত করলেও মনের মাঝে ক্ষীন আশা ছিল, একমাত্র ছেলেকে পড়ালেখা করাবে। সে অতি আক্ষেপে বল্লো, ছেলেটা কাজ করে না। পড়ালেখা শেখে নাই, এখন সে রাজ মিস্তিরির কাজ করে, কিন্তু বাবারে একটাকাও দেয় না। যা আয় করে সব বাজে পথে নষ্ট করে।

তিন বছর আগে বউ মারা গেছে ক্যান্সারে। সংসারে চরম দূর্গতি। ঘরে একজন বোন আছে সেই রান্না-বান্না করে, আর ঘর- দোর গুছিয়ে রাখে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এ কথা বলতে তাঁর বুক চিরে অনেক কষ্ট ও আক্ষেপ ঝরে পড়ে।

তবুও তাঁর চোখে এক টুকরো আনন্দের হাসি চিকচিক করে,কারণ সে তাঁর সমগ্র জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে একটা হাফ ওয়াল দিয়ে ঘর করছে। বোধহয় এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বার্থকতা বা প্রাপ্তি। ছোট বেলায় পড়েছিলাম, পরিশ্রমে  ধন আনে, পূণ্যে আনে সুখ।

সুকুমার দশ বছর বয়স হতে কত পরিশ্রম করছে, হয়তো জীবনে অনেক পূণ্যও করেছে, কিন্তু তাঁর জীবনে ধন বা সুখ কোনটাই আসেনি।

হায়রে জীবন! এরকম নাম না জানা কত সুকুমার দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে চুপিসারে পৃথিবী হতে বিদায় নিচ্ছে, কে তার খবর রাখে!
সুলতানা কাকলি: লেখিকা্, সাবেক গার্লসগাইড

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2020
IT & Technical Support : BS Technology