আজ, রবিবার | ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | সন্ধ্যা ৭:১৩

ব্রেকিং নিউজ :

মাগুরার পিঠা-পায়েসের গল্প

সুলতানা কাকলি : এসে গেল পৌষ মাস। শীতের আগমন চারিদিকে। কুয়াশার চাঁদরে মোড়া জনজীবন! বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে শীতকাল একটু অন্যরকম। কারণ এই সময়ে গ্রাম বাংলার গৃহবধূদের শীতকালের বিশেষ দুইটি পৌষ ও মাঘ মাস কেটে যায় আনন্দ ও ব্যস্ততায়। হেমন্তের নবান্নের ধান ঘরে উঠলেই গৃহবধূদের শীতের পিঠা প্রস্তুতের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। আত্মীয় স্বজন গ্রামমুখো হয় পিঠা পার্বণের টানে। মায়ের হাতের পিঠা খেতে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে আসে।সেই ছোট্রবেলার কথা যদি বলি- সারা বছর যেনো অপেক্ষায় থাকতাম  শীতের ভোরে উঠানে বসে পিঠে রোদ লাগিয়ে পিঠা খাবার মজার আশায়।

শীত এলে শুধু গ্রামবাংলা নয় শহরবাসীদের মাঝেও প্রস্তুতি শুরু হয় বিভিন্ন পিঠা পার্বনের আয়োজনে। অন্যান্য স্থানের মত এ সময় মাগুরাতেও চলে নানা রকম পিঠা তৈরীর আয়োজন।

মাগুরায় বিভিন্ন রকম পিঠার মধ্যে বহুল পরিচিত পিঠা হলো-চিতোই, ভাপা বা ধুপি পিঠা, দুধ চিতোই (ভেজানো), পুলি, পাকান, কুলশি, পাটিশাপটা পিঠা ইত্যাদি। তবে ভেজানো পিঠা মাগুরা অঞ্চলের এক সুস্বাদু পিঠা। এর স্বাদই আলাদা। এই পিঠা তৈরিতে দাদী-নানী, খালা-ফুপুদের পাকা হাতও লাগে।

এ ছাড়াও মাগুরায় অল্প বিস্তর ফুলনদোশা ও বিবিখানা পিঠাও দেখতে পাওয়া যায়। এই সমস্ত পিঠাগুলি মাগুরার ঐতিহ্য বহুল পিঠা। শীত এলেই মাগুরার প্রত্যন্ত জনপদ হতে শুরু করে শহর এলাকাতেও প্রায় প্রতিটা ঘরে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়।

মাগুরার গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন গেরস্ত ঘরে এখনও দিনে ও সন্ধা রাতে ঢেঁকিতে চাল কোটার শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। সন্ধায় কূল বধুরা রান্নাঘর কিংবা উঠোনের কোনে পুঁইয়ের মাচার নীচে বসে উনুনে লাকড়ি দিয়ে বিভিন্ন পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত থাকে।আর বাচ্চারা শীতের কাপড় মুড়ি দিয়ে মা-চাচীদের চারপাশ ঘিরে বসে থাকে পিঠে খাবার আশায়। এ সময় বাচ্চাদের গুঞ্জরনে চুলোর চারিধার হয় মুখরিত। সে এক অনাবিল নয়ন জুড়ানো দৃশ্য।

মাগুরার জনপদে শীত কালে বেশীর ভাগ বাড়িতে চলে চিতোয় পিঠা ও ভাপা পিঠা বা ধুপি পিঠা তৈরীর বিশেষ আয়োজন।

চুলোর পাড়ে বসে গরম গরম চিতোয় পিঠা কলোই শাকের পিটোলি দিয়ে খেতে লাগে দারুণ মজা! সেই সাথে গোশতের ঝোল!আর রাতেই ছাঁচ থেকে গরম গরম পিঠা তুলে হাড়িতে আগে থেকে তৈরি করে রাখা দুধ ও খেজুরের রস কিংবা গুড় বা পাটালি,দুধ দিয়ে মিশ্রিত রসে ভিজিয়ে রাখা হয়। সকালে উঠে রোদে বসে সেই ভেজানো পিঠা খেতে যে কি আস্বাদ তা বলে বোঝানো যায়না। সারা শীত কাল ধরে কোনদিন চিতোয় পিঠা ও দুধ রসে ভেজানো পিঠা, কোনদিন ধুপি পিঠা,পাটিশাপটা পিঠা সহ অন্যান্য পিঠার আয়োজন চলতেই থাকে।

এসময় দেখা যায় আত্মীয় স্বজন যারা দূরে থাকে, কর্ম ব্যস্ততায় পিঠা খেতে আসতে পারেনা তাদের জন্য এবং বিশেষ করে মেয়ে- জামাইয়ের বাড়ীতে পিঠা পাঠানোর চল এখনও মাগুরাতে বিদ্যমান।

এ ছাড়াও শীতের সকালে আলো চাউল ও খেজুর রস সহযোগে পায়েশ রান্না করা হয়, আহ্! সে যেনো শীত মৌসুমের এক বিশেষ আকর্ষণ। পিঠা তৈরির আরও একটা বিশেষ উপকরণ হচ্ছে নারিকেল।

নারিকেল ছাড়া যেন পিঠার স্বাদই হয়না। মনে হয় কোথায় যেন কি অসমাপ্ত রয়ে গেলো। নারিকেল দিয়ে তৈরী কুলসী পিঠা, পাটিশাপটা পিঠা খেতে দারুন লাগে।

এ প্রসঙ্গে বিশেষ ভাবে বিবিখানা পিঠার কথা বলতেই হয়। দুধ জ্বালায়ে ঘন করে খিরসা তৈরি করে তাতে কলা,নারিকেল ও চাউলের গুড়ো মিশ্রিত করে সসপেনে দিয়ে হালকা আঁচে তৈরি করতে হয়। এই পিঠা খেতে দারুণ লাগে।

শীতকালের পিঠা, পায়েস ছাড়া আরো কিছু ঐতিহ্য আছে আমাদের গ্রাম বাংলায়, তা হলো, চাল কুমড়া ও চিনি দেয়ে মোরব্বা তৈরি করা। খেতে দারুণ সুস্বাদু লাগে। শুধু গ্রামের আবহেই নয়,শহুরে আবহেও পিঠা পার্বণের দারুন প্রচলন।

গ্রামের অবয়বে ঢেকিতে চালের গুড়া করতে না পারলেও কলে ভাঙা গুড়া দিয়েও পিঠা খাওয়ার মজাকে উপভোগ করতে কার্পন্য করেনা। মাগুরার শহরবাসীর একটা সুবিধা হচ্ছে, সন্ধ্যার পর মাগুরার বিভিন্ন মোড়ে ধনে পাতা ও শর্ষে বাটা সহযোগে চিতোয় পিঠা বিক্রি হয় এবং ধুপি পিঠা বা ভাপা পিঠাও বিক্রি হয় যা মাগুরা বাসীর ভোজন রসনা তৃপ্ত করে।

প্রতি বছর মাগুরায় ডিসি কোর্ট প্রাঙ্গনে সরকারী তত্বাবধানে আয়োজিত হয় পিঠা মেলা।

এই মেলাতে সরকারী ও অসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছাড়াও শহরের গৃহিনীরাও হাজির হয় বিভিন্ন রকমের জানা অজানা পিঠা নিয়ে মেলার ষ্টলে।

জন সাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই মেলা অত্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। যতদিন মেলা চলে কোর্ট ময়দান এলাকা থাকে উত্সব মুখর পরিবেশ।

দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে, মাগুরাবাসীর মধ্যে পিঠা খাওয়ার পরিধি অনেক বৃদ্ধি হচ্ছে।

শুধু শীতকালেই নয়, বিভিন্ন ঋতুতে ও আচার অনুষ্ঠানে পিঠার প্রচলন রয়েছে। বিয়ে বাড়ীতে বর যাত্রীদের প্রথমেই নানা রকম পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন না করলে যেনো বিয়ে বাড়ীর উত্সব পূর্ণাঙ্গ হয় না। যান্ত্রিকতাবাদের কারণে বর্তমান প্রজন্মের পিঠা খাওয়ার প্রচলন কমে গেলেও পিঠার রসাস্বাদন বা আবেদন কোনদিন কমবে না বলেই আমার বিশ্বাস।

পিঠা পায়েস রান্না আগে উত্তরাধিকার সূত্রেই মানুষ পেয়েছে, কিন্ত হালে সে জায়গা দখল করেছে ইউটিউব।

 

 

পিঠা নিয়ে কবি সুফিয়া কামালের সেই অনবদ্য চরণ এখনও মনে দোলা দেয়-
পৌষ মাসের পিঠা খেতে বসে
খুশিতে বিষম খেয়ে,
আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে
মায়ের বকুনি পেয়ে’।

সুলতানা কাকলি: লেখিকা, সাবেক গার্লস গাইড

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology