আজ, সোমবার | ১৪ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | সকাল ১১:৫৮


গণহত্যা দিবস : ইতিহাস কথা কয়

ড. আতিউর রহমান : প্রচলিত ইতিহাস পড়ে আমরা আমাদের মানুষের মনের গহীনে বয়ে বেড়ানো দুঃখের কথা, দুঃখ বেদনার কথা জানতে পারি না। এই ইতিহাসে ঝড়ের কথা থাকে কিন্তু ঘরের কথা সেভাবে থাকে না। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘যে সকল দেশ ভাগ্যবান তাহারা চিরন্তন স্বদেশকে দেশের ইতিহাসের মধ্যেই খুঁজিয়া পায়, বালককালে ইতিহাসই দেশের সহিত তাহাদের পরিচয়সাধন করাইয়া দেয়। আমাদের ঠিক উল্টা। দেশের ইতিহাসই আমাদের স্বদেশকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে।’

অথচ স্বদেশের সঙ্গে নিগূঢ় বন্ধন তৈরির সবচেয়ে বড়ো উপায় হচ্ছে ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের অতীতের সাথে সঠিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া। অতীত ও বর্তমান যে মোটেই বিচ্ছিন্ন নয়। এ কথাটি গোড়া থেকেই তাদের কচি মনে গেঁথে দেয়াই হওয়া উচিত আমাদের ইতিহাস চর্চার মূল কাজ। বাংলাদেশের সা¤প্রতিক ইতিহাস নিয়ে স্বার্থান্নেষী মহল কতোই না ছক্কা-পাঞ্জা খেলেছে। আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিমূলক করার জন্য কতো নিম্নমানের অপচেষ্টাই না করা হয়েছে। কতো খলনায়ককে মহানায়ক করার অপচেষ্টাই না করতে দেখেছি। এই অপইতিহাস তৈরির ফলে এদেশের তরুণ প্রজন্মের মন থেকে একাত্তরের সত্যিকারের ইতিহাস প্রায়ই মুছে গিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস যে ছাইচাপা আগুনের মতো। ধিকিধিকি করে জ্বললেও তা পুরোপুরো নেভানো যায় না। আর সে কারণেই ছেচল্লিশ বছর পরে হলেও ২৫ মার্চ, ১৯৭১ এর কালোরাত্রির কথা সগৌরবে ফিরে এসেছে আমাদের ইতিহাসের পাতায়। গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশের মহান সংসদকে।

ধন্যবাদ সংসদ সদস্য শিরীন আখতারকে ২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাবটি উপস্থাপনের জন্য। তাঁর প্রস্তাবের উপর সাধারণ আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধন্যবাদ জানাই মাননীয় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন। ধন্যবাদ মাননীয় স্পীকারকে ও সকল সংসদ সদস্যকে সর্বসম্মতভাবে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি পাশ করার জন্য। সকলে মিলেই তাঁরা আমাদের এভাবে গৌরবান্বিত করেছেন।

প্রায় সাত ঘণ্টা আলোচনার পর ১১ মার্চ শনিবার সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এ প্রস্তাবের উপর আলোচনার সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কি নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা তার বিবরণ তুলে ধরেন। নানা ভিডিও ক্লিপ, প্রকাশিত সংবাদের ছায়াচিত্র, হৃদয়গ্রাহী ছবি উপস্থাপন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরো সংসদের দৃষ্টি তাঁর উপস্থাপনার দিকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। পিনপতন স্তব্ধতার মধ্যে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বের পত্রিকায় এসেছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কিভাবে গণহত্যা করেছে। আমি নিজে চোখে সেই বিভীষিকা দেখেছি। বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে গণহত্যার চিহ্ন নেই। হানাদার বাহিনী এসেছিল পাকিস্তান থেকে। এদেশের পথঘাট তাদের চেনার কথা নয়। তাদের পথঘাট চিনিয়েছে আলবদর, রাজাকার, আল শামস আর জামাত-শিবির। এরাই ছিল পাকিস্তাানীদের দোসর। যে গণহত্যা বাংলাদেশে হয়েছে তার জন্য পাকিস্তানী বাহিনী যতটা দায়ী ততটাই দায়ী আলবদর, আল শামস, রাজাকাররা’।

এই প্রস্তাবটি সংসদে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণের মাধ্যমে বাঙালি বেশি খানিকটা কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। ইতিহাস নিশ্চয় বাঙালির এই ঐকমত্যের জন্যে সকল সংসদ সদস্যদের কৃতিত্ব দেবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা ধরে বাঙালিকে কি বিভৎস ও নৃশংস সময় পার করতে হয়েছে তা বুঝতে পারবে।

একাত্তর বাঙালির জীবনে এক মিশ্র অনুভূতির সময়।
স্বাধীনতা লাভের আনন্দ ও স্বজন হারানোর বেদনায় সিক্ত একাত্তর। একাত্তরের পঁচিশ মার্চ সন্ধ্যেবেলায় বোঝা যায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আঘাত হানতে যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলোর ওপর। ততক্ষণে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা ভেস্তে গিয়েছে। প্রতিবাদী বাঙালি রাস্তায় রাস্তায় গাছ কেটে, বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। নেতৃবৃন্দ নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। শুধু হিমালয় পাহাড়ের মতো ঠাঁয় বসে আছেন বঙ্গবন্ধু তাঁর ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে। তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন সহযোগী নেতৃবৃন্দকে। যে কোনো মুহূর্তে তাঁকে গ্রেফতার করা হবে সে ইংগিত তিনি পেয়ে গেছেন। দারুণ উদ্বিগ্ন তিনি স্বদেশের ভাগ্য নিয়ে। তরুণদের বলে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। ‘অপরাশেন সার্চ লাইট’ নামের অভিযানে নেমে পড়েছে হানাদার বাহিনী। তাদের সামরিক বহর এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ইপিআর সদর দপ্তরের দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল (সাবেক ইকবাল হল), জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, সূর্যসেন হল, সলিমুল্লাহ হল, মহসিন হলে ব্যাপক আক্রমণ চালায় তারা। হলগুলোর নেতৃস্থানীয় ছাত্ররা আগেই দূরে সরে গিয়েছিলেন। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর ব্যাপক গুলিবর্ষণ করা হয় অতর্কিতে। এসব হলের কর্মচারীদের রেহাই দেয়া হয়নি। জীবিতদের দিয়ে শহীদদের লাশ মাটি চাপা দিতে বাধ্য করে হানাদারেরা। শিক্ষকদের ওপরেও ব্যাপক আক্রমণ হয়। এক ডজনের মতো শিক্ষকদের হত্যা করা হয় পঁচিশের রাতেই। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে আরেক দফা আক্রমণের শিকার হন শিক্ষকরা। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ওপর এই অমানবিক আক্রমণে স্তম্ভিত হয়ে যায় বিজয়ী বাঙালি।

পঁচিশের কালো রাত প্রতিরোধকারী পুলিশ বাহিনী ও পিলখানার ইপিআরদের ওপর যে রক্তাক্ত আক্রমণ চলে সে নির্মমতার কথা ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল। ঢাকা শহরের আরো নানা স্থানে এই আক্রমণ ঘটে। শাহবাগের ‘দি পিপল অফিস’, ‘ইত্তেফাক ভবনে’ আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অনেক সাংবাদিক ও কর্মী এই আক্রমণে প্রাণ হারায়। এই আক্রমণ যখন চলমান, ছাব্বিশে মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এর পর পরই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ২৫ শের রাতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই কত ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকের প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে তা বলা মুশকিল। কয়েক হাজার মানুষ ঐ রাতেই ঢাকা শহরে প্রাণ হারান। এ আক্রমণ শুধু ঢাকায় সীমিত ছিল না। সারাদেশেরই ক্যান্টমন্টগুলো থেকে হানাদার বাহিনী বের হয়ে আসে আশে পাশের শহরগুলোতে আক্রমণের উদ্দেশ্যে। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, প্রতিবাদী ইপিআর, পুলিশ, সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রতিরোধ দাঁড় করাবার চেষ্টা করেন। কোনো কোনো অঞ্চলে সফলও হন। বেশ কিছুদিন এই প্রতিরোধকারীদের দখলে ছিলো বাংলাদেশের বিরাট অঞ্চল। কিন্তু ধীরে ধীরে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী এগুতে থাকে সারা বাংলাদেশের দখল নিতে। থেমে থেমে যুদ্ধ চলতে থাকে। এক সময় কৌশলগত কারণে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পারি দিয়ে প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে আশ্রয় নেন। অনেকেই দেশের ভেতরেও প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলেন। প্রতি দিনই চলতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ। গেরিলাদের আক্রমণে এতোটাই শংকিত ছিল পাকিস্তানী বাহিনী যে তারা নিজেদের সুরক্ষিত এলাকার বাইরে বের হতে ভয় পেতো। কিন্তু তাদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতো এদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার। যাদের নাম আল বদর, রাজাকর, আল শামস। যাদের কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর উপস্থাপনায় বলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস ধরে সুযোগ পেলেই এই দোসরদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী চালিয়েছে গণ হত্যা। শুধুমাত্র বাঙালি বলে, হিন্দু বলে অতর্কিত আক্রমণ করা হতো বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। শেরপুরের কয়েকটি গ্রামে অতর্কিত হামলা করে সব ক’জন পুরুষকে হত্যা করা হয়। নারীদের করা হয় নির্যাতন।

এ সব গ্রামকে এখন বলা হয় বিধবার গ্রাম। এদের কাছে আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে সিএসআর কর্মসূচি চালু করার জন্যে গিয়েছিলাম। এ সব মায়েদের চোখে মুখে কি যে কষ্ট আমি দেখেছি তা আজ আর প্রকাশ করতে পারবো না।

এমন গ্রাম-গঞ্জ সারা বাংলাদেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যাদের প্রাণ গিয়েছিল সেসব সৈনিকদের স্মৃতি সংরক্ষণে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে কি সুন্দর ওয়ারসিমিট্রি বা স্মৃতির বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। বৃটিশ দূতাবাস এখনও সেগুলো রক্ষণা বেক্ষণ করে। অথচ আমাদের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে গণকবরগুলোকে ঘিরে তেমন কিছুই আজো আমরা করে উঠতে পারিনি। আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকবে যে সারা বাংলাদেশ জুড়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে গণকবরগুলোকে কেন্দ্র করে স্মৃতির বাগান গড়ে তোলার জন্যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় একটি বড়ো প্রকল্প যেন একনেকে নিয়ে গিয়ে পাশ করিয়ে নেয়। আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধামন্ত্রী এরকম প্রস্তাবে খুশিই হবেন। সমর্থনও দেবেন।

জাতিসংঘ ২০১৩ সনের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে এবং এমন কর্ম প্রতিরোধের সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর সারা বিশ্বে গণহত্যা স্মরণ দিবস পালনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ঐ দিন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছিলেন গণহত্যা একদিনে ঘটে না। পরিকল্পিত উপায়ে, টার্গেট করে গণহত্যা ঘটানো হয়। ধর্ম, বর্ণ, এথনিসিটি বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে নৃশংস উপায়ে একটি জনগোষ্ঠীকে নিঃশেষ করার এই প্রক্রিয়া মানব অধিকার বিরোধী অবপরাধ। সকল জাতির, প্রতিনিধিকে তিনি অনুরোধ করেন এই বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার জন্য। এই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক উপদেষ্টা এডাম দিয়েং। তিনি সেদিন বলেছিলেন, এটি যেমন অতীতের বিষয়, তেমনি ভবিষ্যতেরও। স্মরণ ও আগামীর কার্যক্রম একই সুতোয় গাঁথা। আমরা স্মরণ করবো আগামী দিনের গণহত্যা বন্ধের জন্য। উপমাহসচিব হ্যান ইলিয়াসন সেদিন বলেছিলেন, ‘যারা এ জঘণ্য আক্রমণের জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি, তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি এবং যে সম্প্রদায়ের সদস্য তারা তার প্রতি আমাদের বিরাট দায় রয়েছে। তাদের শারিরীক ও আবেগের ওপর গণহত্যাার যে ক্ষত তৈরি হয়েছে সে সবের প্রতিও আমাদের দায় রয়েছে।’

আমাদের গণহত্যার ব্যাপ্তি আরো গভীর। যারা এর শিকার তাদের পরিবারের সদস্যদের, তাদের সুহৃদদের চোখের পানি মুছে গেলেও তার দাগ কিন্তু মোছেনি। আমাদরেই ব্যর্থতা যে এমন গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী গণতহত্যাকে বিশ্ব মানসপটে আমরা আজো সেভাবে তুলে ধরতে পারি নি। একাত্তরের ভ‚-রাজনীতির ধূম্রজালে আমাদের শহীদদের রক্ত ও কান্না আন্তর্জাতিক পরিসরে সেভাবে স্থান করে নিতে পারে নি। তবে ঐ সময়ের প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কিন্তু ঠিকই এই গণহত্যার বিবরণ তুলে ধরেছিল। ১৯৭১ সনের এপ্রিল মাসে নিউইয়র্ক টাইমস ‘বাংলায় রক্তগঙ্গা’ শিরোনামের এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল নির্বিচারের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মৌনতা নিন্দনীয়।’ ঐ বছর মে মাসের আরেক প্রতিবেদনে পত্রিকাটি বলেছিল, ঐ সময়ের সবচেয়ে রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড বাংলায় ঘটেছিল।

লন্ডনের সানডে টাইমস, ১৩ জুন ১৯৭১ তারিখে এনটনি মাসকারেনথাসের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ‘গণহত্যা’। সরেজমিনে তিনি জেনেছিলেন কি করে প্রতিদিন পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী বাঙালীদের ধরে এনে হত্যা করা হচ্ছিল। এই প্রতিবেদন সারা বিশ্বের বিবেককে দারুণভবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তখনকার জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে পূর্ব বাংলার হত্যাকাণ্ডের তীব্রতার কথা লিখেছিলেন। ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কুটনীতিক আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ নামে প্রতিবেদন পাঠিয়ে ছিলেন। সম্প্রতি গ্যারী বাস ‘হুয়াট হাউস’ এর ডিক্লাসিফাইড টেপ ঘেটে যে বই লিখেছেন তার শিরোনাম ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’। এতো সব তথ্য প্রমাণ থাকা সত্তে¡ও আমরা পারিনি আমাদের এই গণহত্যার কথা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সেভাবে জানাতে। দেরিতে হলেও আমাদের জাতীয় সংসদ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের যে প্রস্তাব পাশ করেছে তার ওপর ভিত্তি করে আমরা দেশে এবং বিদেশে এই গণহত্যার বিষয়ে অনেক কথাই এখন বলতে পারবো।

সরকারও এ বিষয়ে দ্রুত কাজ করতে শুরু করেছে।
গত ২০ মার্চ মন্ত্রীপরিষদের সভায় প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এ গণহত্যার বিষয়টি জানানোর উদ্যোগ নেবার জন্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এজন্যে একটি ডেস্ক খুলেছে এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ কাজ শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘হলোকাষ্ট’ এবং রুয়ান্ডার গণহত্যাকে জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে পারি তাহলে আমাদের গণহত্যার বিষয়টিও তারা গ্রহণ করবে। এ জন্যে হয়তো সময় লাগবে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের অ্যাডভোকেসি চালিয়ে যেতে পারি তাহলে নিশ্চয় এটা অর্জন করা সম্ভব। ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ব্যাক্তি, সংগঠন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেছিল। তারাও নিশ্চয় আমাদের এই আবেদন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। আর গণমাধ্যমের সহযোগিতাতো পাবই।

আন্তর্জাতিক এই তথ্যাভিযানের পাশাপাশি আমাদের দেশের ভেতরেও সচেতনায়নধর্মী নানা কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর নতুন করে সজ্জিত হচ্ছে। এই কাজে এই প্রতিষ্ঠান আগে থেকে সম্পৃক্ত ছিল। এখন নতুন পরিসরে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আরো ভালভাবে দেশে-বিদেশে গণহত্যা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগী হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের বিশ্ববিদ্যারয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও গণহত্যার নানাদিক নিয়ে গবেষণা করবে বলে আমার ধারণা। এখন থেকে আমরা পঁচিশ মার্চ সন্ধ্যেবেলা প্রত্যেকেই একটি করে মমবাতি হাতে নিয়ে সম্মিলিত স্মরণ সন্ধ্যার আয়োজন করতে পারি। ঐ রাত্তিরে আমরা গণহত্যার যারা শিকার হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারি। আর সম্মিলিতভাবে সরকারের কাছে দাবি করতে পারি সারা দেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গণ কবরগুলোকে কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ‘ওয়ার সিমেট্রির’ মতো করে গভীর যতেœর সাথে গড়ে তোলার জন্যে। প্রতিটি ২৫ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে গণহত্যার স্মৃতিকে যেমন উস্কে দেবে, তেমনি আগামীতে যেন আর এমন দুর্ভাগ্য কোনো জনগোষ্ঠীর জীবন না আসে সেই দাবি বিশ্বব্যাপী জোরালো হবে। ইতিহাস সর্বদাই সময় মতো কথা কয়। তাই আসুন, ইতিহাস চর্চায় আমরা আরো বেশি নিবেদিত প্রাণ হই।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology