আজ, মঙ্গলবার | ১৫ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | সকাল ১০:১০


মাগুরাবাসীর স্মৃতিতে অমলিন ফুটবলার ‘প্রেম’

জাহিদ রহমান : মাগুরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ‘ফুটবলার প্রেম’ নামটি এখনও ভীষণ উজ্জ্বল এক স্মৃতি। আশির দশকে মাগুরাতে আয়োজিত বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে প্রেম বাহাদুরের মনমাতানো ছন্দময় ড্রিবলিং ক্রীড়ামোদীদের হ্নদয় থেকেই মুছে যায়নি।

সাবেক ফুটবলার প্রেম। পুরো নাম প্রেম বাহাদুর রানা। জন্মসূত্রে কুষ্টিয়ার মানুষ হলেও তিনি নেপালী বংশদ্ভ‚ত। দারুণ ছন্দময় ফুটবল খেলতেন-প্রেম। ফরোয়ার্ড লাইন এবং লিংক দুই পজিশনেই ছিল সমান দক্ষ। বলের উপর দীর্ঘক্ষণ ধরে অসম্ভব নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারতেন। মাগুরার কোর্ট বিল্ডিং বা নোমানী ময়দান মাঠে এই ফুটবলার  নান্দনিক ড্রিবলিং-এর মাধ্যমে ডিবক্স বা পেনাল্টি বলে ঢুকে গোল করে যে আনন্দ দিতেন সেই স্মৃতি এখনও ক্রীড়ামোদীদের হ্নদয়ে লেপ্টে আছে। স্বভাবতই মাগুরার ফুটবল নিয়ে কোনো স্মৃতিময় আলোচনার সূত্রপাত হলে এই নামটি অণিবার্যভাবেই উঠে আসে।

আশির দশকে মাগুরার মাঠে খেলতে খেলতে প্রেম বাহাদুর সবার কাছেই হয়ে উঠেছিলেন বড় চেনা এবং ভীষণ প্রিয়। শারীরিক গঠনে একটু খর্বৃাকৃতি হলেও ‘বলপ্লেয়ার’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। অনেকের মতেই মতেই চুম্বকের মতো বুটের সাথে বলকে জড়িয়ে রাখতেন তিনি। ফুটবলের সেই স্বর্ণালী যুগে মাগুরার ফুটবলে স্থানীয়দের মধ্যে ধারাবাহিভাবে দাপট ছিল বড় মোহন, মোহন (ভায়না), লোভন, মকবুল, কাজী ফিরোজ, মোস্তফা, আসাব, আনোয়ার, তপন, মহসীন, আহমেদ, সুজা, কামাল, ছোট মোহন, কোমল, রনজুসহ আরও অনেকের। এসময় মাগুরার বাইরে থেকে  বিভিন্ন টুর্ণামেন্টে নিয়মিত খেলতে আসেন যশোর থেকে রকিব, জিল্লুর, সাথী, কালাম, আজাদ, চুয়াডাঙ্গার দাপুটে ফুটবলার লিটন, খুলনার মুসলিম স্পোর্টিং-এর বুলু , ঝিনেদার আফাঙ্গির, মধু, নিশিথসহ আরও অনেকেই। আর একই সাথে মাঠে প্রেম বাহাদুর থাকলে যেনো আরও বাড়তি উত্তেজনা ও আনন্দের উত্তাল ঢেউ উঠতো।

প্রেম বাহাদুর জানান, মাগুরার মাঠে তিনি প্রথম খেলতে আসেন ৭৫ সালে। এরপর আশির দশকের প্রায় পুরো সময় জুড়েই বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলেন ইয়থ ক্লাবসহ অন্যান্য ক্লাবের হয়ে। প্রেম বাহাদুর বলেন, ফুটবলার মোহন (পাল্লা) তাঁকে প্রথমে মাগুরাতে নিয়ে আসে। কৃষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মিলে একসাথে খেলার সময় ফুটবলার মোহনের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সূত্রেই মাগুরাতে খেলতে আসেন। এরপর মাগুরার মাঠে আস্তে আস্তে তাঁর পরিচিতির ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। মাগুরার বাইরে শ্রীপুরেও তিনি একাধিক ম্যাচে অংশ নেন। প্রেম বাহাদুর আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল ছেড়েছেন নব্বই-এ। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে প্রাইভেট কোম্পানী ‘ফরিদপুর ইন্ডাষ্ট্রীজ’-এ একটি ছোটখাটো চাকরিতে যোগ দেন। এখনও সেই চাকরিই করছেন।  থাকেন বনানীতে।

স্বাধীনতার পরপরই কুষ্টিয়াতে প্রেমের ফুটবলের হাতে খড়ি হয়েছিল কুষ্টিয়ার মিলপাড়ার দেবীপ্রসাদ ক্লাবের হয়ে।  এরপর কুষ্টিয়া মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং খুলনার টাউন ক্লাবে নিয়মিত খেলেন। এরপর ৭৩ সালে কুষ্টিয়া জেলা একাদশের হয়ে দারুণ পারফর্ম করেন তিনি। সেবার শেরেবাংলা কাপ ফুটবলে কুষ্টিয়া জেলা ফাইনালে উঠে। ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচে ঢাকা জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়, তার জেলা রানার আপ হয়। সেসময় এই ম্যাচের ধারাভাষ্য রেডিওতেও প্রচার হয়।

ফুটবলার প্রেম ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে প্রথম নাম লেখা ১৯৭৪ সালে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে। এক বছর পর দলবদল করে চলে আসেন ওয়াপদা ক্লাবে। এখানে এসে কোচ হিসেবে পান গফুর বেলুচকে। এরপর ৮০ সালে দলবদল করে যোগ দেন ওয়ারী ক্লাবে। ওয়ারী থেকেই ৮৯-৯০ এ ফুটবলকে বিদায় জানান। তবে এর মাঝে ১৯৭৫ সালে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের পক্ষ হয়ে একবার অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে আগা খান গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলেছিলেন।

সাবেক ফুটবলার প্রেম বাহাদুরের জন্ম কুষ্টিয়াতে হলেও তাঁর আদি নিবাস নেপালে। ব্রিটিশ আমলে তাঁর বাবা সুখ বাহাদুর রানা চাকরির সুবাদে কুষ্টিয়াতে এসে স্থায়ী হন। তাঁর মায়ের নাম দিলদারা দেবী। প্রেম বাহাদুর দুই সন্তানের জনক। ছেলেন নাম প্লে বাহাদুর রানা। আর মেয়ের নাম মার্টিনা দেবী। আশির দশকে মাগুরার মাঠের সেই ফুটবলের কথা মনে পড়লে প্রেম বাহাদুর রানা ভীষণ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলেন, ‘মাগুরার কোর্ট  বিল্ডিং মাঠের সেই খেলার স্মৃতি ভুলি বলিনি। ফুটবলের উপচে পড়া আনন্দ ছড়িয়ে পড়তো চারিদিকে। কত মানুষ আসতো খেলা দেখতে।’ বয়সের কারণে এখন অনেক নাম তিনি ভুলে গেছেন। তবে মোহন (পাল্লা), লোভন, মকবুল, কাজী ফিরোজ, মোস্তফা, আহমেদ-এর নাম তাঁর কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। একবার সুযোগ পেলে তিনি আবার মাগুরা যাবেন বলে জানান।

জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল পুরনো গৌরব হারিয়ে ফেলায় অনেকের মতো তিনিও হতাশ। তবে প্রেম বাহাদুর রানা মনে করেন তৃণমূলে বা মফস্বলে ফুটবল এখনও জনপ্রিয়। ভালো টুর্নামেন্ট হলে দর্শকের কমতি হয় না। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল মনোযোগ হারানোর কারণেই ফুটবলের বড় ক্ষতিটা হয়ে গেছে। ফুটবলের সাথে সংশ্লিষ্টদের এসব নিবিড়ভাবে ভাবতে হবে।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology