আজ, মঙ্গলবার | ১৫ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ভোর ৫:৫৪


পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর অপরূপ দিন

সুলতানা কাকলি : এইতো কিছুদিন আগের টাটকা স্মৃতি। শহরের কোলাহল এবং সংসার যজ্ঞের সকল বিড়ম্বনাকে পেছনে ফেলে বেছে নিলাম প্রিয় কয়টা দিন! জীবনের সকল ব্যস্ততাকে তুচ্ছ করে কয়েক দিনের জন্য ভাসিয়ে দিলাম আনন্দময় স্রোতে। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম কয়েক দিন নিজেদের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর। কোথায় যাওয়া যাই? বন, পাহাড়, সাগর আমাকে খু—ব মন পাগল করে। এক কথায় যাকে বলে আমি প্রকৃতি প্রেমিক।

এক সময় কয়েক বছরের জন্য স্বামীর চাকরি সুত্রে ভাগ্যে জুটেছিল পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে থাকার। সেখানকার পাহাড়, ঝর্ণা, কাপ্তাই লেক, প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল প্রচুর। সেই স্মৃতি আজও অমলিন।

রাঙামাটি থাকাকালীন সময়ে পাশেই খাগড়াছড়ি বার দুয়েক বেড়াতে গেলেও সাজেক ও বান্দরবান ঘুরতে যাওয়া হয়নি। তাই এবার সিদ্ধান্ত হলো সমগ্র পাবর্ত্য জেলা ঘুরে দেখবো। সিদ্ধান্ত ঠিক করতেই  আমি তো আনন্দে আত্মহারা। তাই প্রাণের টানে “খাগড়াছড়ি, সাজেক, রাঙামাটি ও বান্দরবানের” নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সাথে মিতালি করার জন্য এল মহেন্দ্রক্ষণ।

২৩ ফেব্রুয়ারি, বিকাল পাঁচটায় আমরা দুই পরিবারের ছয়জন ভ্রমন যোদ্ধা মাগুরা টার্মিনাল হতে সাতক্ষীরা থেকে আগত ঈগল পরিবহনে সরাসরি খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। রাত একটায় কুমিল্লায় হোটেলে রাতে ডিনার সেরে আবার রওনা হলাম। তখনো তেমন ভাবে মন পিঞ্জিরা আনন্দে বিগলিত বা উচ্ছাসে পুলকিত হয়নি। সবকিছু স্বাভাবিক ধরে গাড়িতে স্থির হয়ে বসে ঘুমানোর চেষ্টা করছি।

গভীর রাতে ফেনি পেরিয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে দু’পারের পাহাড়ের সারির মধ্য দিয়ে ভীষণ উঁচু-নিচু আঁকাবাকা পথ দিয়ে খাগড়াছড়ির পথ ধরে গাড়ি ছুটলো। গাড়ীর হেড লাইটের অতটুকু আলোতে সামান্য দেখাতেই প্রাণটা নেচে উঠলো।আহা! একি দৃশ্য! এ যেন স্বপ্ন রাজ্যের রাজকুমার পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় করে রাজকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে অচিন পথের অজানা ঠিকানায় ছুটতে শুরু করলো। এই অনুভুতির তুলনা হয় না।

গভীর রাতে পাহাড়ের মৌণতা ভেঙে সর্গজনে গাড়ীর ছুটে চলা, আর হেড লাইটের আলোয় প্লাবিত সকল প্রকৃতি বিমুগ্ধ নয়নে উপভোগ করছিলাম। রামগড় ছাড়িয়েই গুঁইমারা-সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট! দুরন্ত গতিতে ছুটে চলার ফাঁকে দৃষ্টিগোচরে যেটুকু ধরা পড়লো তাতেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো পাহাড়ের ভিতর সারি সারি বন বিথী বেষ্টিত অপূর্ব ছিমছাম সাজানো ক্যাম্পটি নয়নাভিরাম মুগ্ধকর! পথ এক সময় শেষ হলো।

চব্বিশ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ছয়টায় খাগড়াছড়ির প্রাণকেন্দ্র দোয়েল চত্বরে এসে গাড়ি থেকে নামলাম। এটাই শেষ স্টপেজ। এখান থেকেই চাঁদের গাড়িতে সাজেক যেতে হবে। দীর্ঘ যাত্রা পথে এবং রাতে ঠাঁই গাড়ীতে বসে থেকে শরীর ভীষণ আড়ষ্ট হলেও ভ্রমণ পিয়াসু মনে কোন ক্লান্তির ছায়া অনুভূত হলো না। একত্রে ভ্রমন সঙ্গী জমির খান, ভাস্তি জামাই খাগড়াছড়িতে পুলিশ বিভাগে চাকুরি করেন। তার বাসায় একটু রেস্ট নিয়েই সবাই শহর দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

শহরটির চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বৃহৎ শৃঙ্গগুলি যেন দূর হতে ইশারা করে, কাছে যেতে, চূড়ায় উঠতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আলুটিলা গুহা দেখার জন্য মনটা বিশেষ ছটফট করছিলো, তাই চলতি পথে যতটুকু নৈসর্গিক শোভা দেখা যাচ্ছিল সেটুকু দেখেই সন্তুষ্ট হচ্ছিলাম। আলুটিলা গুহাটি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার মূল শহর হতে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে সমুদ্র সমতল থেকে তিন হাজার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট আলু টিলা পাহাড় বা আরবারি পাহাড়ে আলুটিলা গুহা অথবা রহস্যময় সুড়ঙ্গ অবস্থিত। স্থানীয়রা একে বলে মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা। এত উচ্চতায় অবস্থিত এটি তা আগে জানা ছিলোনা। ভেবেছিলাম, মেইন রাস্তা হতে একটু এগোলেই কোন পাহাড়ের ভিতর আলুটিলা গুহার প্রবেশ দ্বার! কিন্তু গাড়ি মসৃন ও আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উপরে উঠছে তো উঠছেই! কত উচ্চতায় পাহাড়ের মাথায় যেয়ে গাড়িটি দাড়ালো বুঝলামনা! দেখি পাহাড়ের উপর বিশাল এলাকায় উপজাতি মহিলারা নানা রকম দোকানপাট সাজিয়ে বসে আছে। আমাদের দেশের মেলার মতন। বিশাল প্রবেশ দ্বারে টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। অনতিদূরেই ছিমছাম সাজানো কফি শপ। মুগ্ধকর কফিশপে এককাপ কফি খেতেই হবে। কফিশপের পাশ দিয়ে আলুটিলা গুহার সিঁড়ি পথ। আমরা নামছি তো নামছিই। সিঁড়ির শেষ নেই। অবশেষে এক সময় কাঙ্খিত আলুটিলা গুহার মুখে এসে দাঁড়ালাম।

ঘন সবুজ জঙ্গলে ঢাকা রহস্য ময় এই আলুটিলা গুহাটি প্রায় একশত পঞ্চাশ ফুট লম্বা। ভিতরে গাঢ় অন্ধকার ও ভেজা স্যাঁতসেঁতে। ভিতরে খুবই শীতল অনুভূতি, আপনি যদি একটু সাহসী হন তবে সহজে ভিতরে ঢুকতে পারেন! বিশ মিনিটেই গুহার এ মাথা দিয়ে ঢুকে অন্য মাথা দিয়ে নিরাপদেই বেরিয়ে আসতে পারবেন। আলুটিলা গুহা দেখে লাঞ্চ করে ক্ষণিকের বিরতি দিয়ে আবার আমরা ছুটলাম জেলা পরিষদের হর্টি কালচারপার্ক দেখতে। এটি খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাত্র চার কিলো মিটার দূরে জিরো মাইলএলাকায়, পাহাড়ের চূড়ায়, নয়না ভিরাম এই পার্কটি অবস্থিত। দুটি পাহাড়কে একটি ঝুলন্ত ব্রীজের মাধ্যমে সংযুক্ত করে স্হাপিত হয়েছে এই পার্কটি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে হ্রদ, স্বচ্ছ কাঁচের মতন পানি। দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা করে। এই হ্রদে নৌবিহারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে রয়েছে কুলিংকর্ণার, চা-কফি ও হরেক রকমের খাবারের পসরা নিয়ে সাজিয়ে বসে থাকে দরিদ্র নৃগোষ্ঠীরা। পার্কের সমস্ত স্থানে ফলজ বনজ বৃক্ষরাজি ও সুশোভিত হরেক রকম ফুলগাছের সমাহার। থোকা থোকা ফুটে থাকা ফুলগুলো মনকে প্রফুল্ল করে তোলে।

লোকমুখে জানতে পারলাম এখানে মাঝে মাঝে নাটক সিনেমার সুটিং করা হয়। সন্ধা নামার পর এলাকাগুলি আঁধারে ঢেকে যেতে লাগলো। ভরপুর মন নিয়ে আমরা সবাই মেয়ে-জামাইয়ের বাসায় ফেরত এলাম। পরদিন পঁচিশ ফেব্রুয়ারী সকাল নয় টায় আমরা সাজেকে যাবার জন্য আগে থেকে রির্জাভ করা চান্দের গাড়ীতে উঠে বসলাম। দোয়েল চত্বর হতে অগনতি শ’য়ে শ’য়ে চান্দের গাড়ি ও সিএনজি গুলো সকাল সাতটায় যাত্রী বোঝাই করে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে। দুপুর একটার মধ্যে সাজেক গামী পর্যটকদের জন্য অল ক্লিয়ার অন দ্যা দোয়েল চত্বর। কারণ দিঘিনালা আর্মি ও পুলিশ ক্যাম্প হতে প্রতিদিন দুই বেলা সকাল দশটায় ও বেলা তিনটায় পর্ষটকদের অনুমতি নিতে হয়।

কারণ ওখান থেকেই সেনাবাহিনী সকল পর্যটকদের এসকর্ট করে সাজেক নিয়ে যায়। ওই দুটি সময় মিস করলে পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাই যারা যাবেন এ দিকটা খেয়াল রাখবেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে শ’য়ে শ’য়ে সিএনজি, মোটরবাইক আর চান্দের গাড়ী উন্মত্ত গতিতে উর্ধ্বগামী হয়ে ছুটে চলেছে। সামান্য এক চিলতে রাস্তা! ওদিক হতে ছুটে আসা গাড়ী সগর্জনে কিভাবে যে-সাইড কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে আল্লাহ মালুম। ভয়েতে চোখ বন্ধ করে ফেলছি আর ইয়ানফসি পড়ছি।

খাগড়াছড়ি হতে সাজেকের দূরত্ব সত্তুর কিলোমিটার। যদিও সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন, তবুও শুধুমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার্থে খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হয়। সাজেককে রাঙা মাটি জেলার ছাদ বলা হয়। এত উচ্চতায় অবস্থিত যে ওখান থেকেই রাঙামাটি শহরের অনেকাংশ দেখা যায়। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য দক্ষিণে রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম ও পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দিঘিনালা উপজেলা।

রাস্তার দুধারে, পাহাড়ের পাদদেশে, পাহাড়ের চূঁড়ায়, বা পাহাড়ের গায়ের ভাঁজে ভাঁজে জনবসতি। রাস্তার দু’ পাশের পাহাড়ি বাড়িগুলোর বাচ্চারা এসে পথের ধারে সারি বেধে দাড়িয়ে আছে। যে গাড়ী আসছে হাত নেড়ে বাই বাই দিচ্ছে, কোন কোন গাড়ী হতে টাকা ছুড়ে দিচ্ছে, ওরা দৌড় দিয়ে তা কুড়িয়ে নিচ্ছে আর মলিন মুখ গুলো খুশিতে ভরে যাচ্ছে। পথে যেতে কাসালং ব্রীজ ও কাসালং নদী টাইগার টিলা আর্মি পোস্ট, আর দৃষ্টি নন্দন পাহাড়ীর প্রকৃতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বাজার, গ্রাম, দেখতে দেখতে সাজেক পৌঁছে গেলাম। আগে থেকে রিসোর্ট বুক করে রাখাতে সুবিধাই হলো।

ম্যানেজারের কাছ থেকে জানতে পারলাম, লাঞ্চ, ডিনার ইত্যাদির জন্য নাকি আগেই খাবার বুকিং দিতে হয়। ব্যাগেজ গুলো রুমে রেখেই আবার বেরিয়ে পড়লাম খাবার হোটেলে বুকিং দিতে। হঠাত নিমিষেই মনে হলো কুয়াশা ঘেরা শীতের ভোরের অন্ধকারে পথে হাটছি। মনে হলো কুয়াশার ভেতর হাটছি! আবার মনে হলো মেঘের ভিতর দিয়ে হেটে চলেছি। পরক্ষণেই বুঝলাম! সত্যিই মেঘগুলো আমাদের শরীরকে ছুয়ে উড়ে যাচ্ছে। দূরে সরেযাচ্ছে কিছুতেই ধরতে পারছিনা, ছুতে পারছিনা। এখানে তিন রকম প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুভূত হয়। একটু রোদ্দুর,গরম,আবার কুয়াশার চাদরে মোড়া ও শীতল সহনীয় সজীব অনুভুতি। আমরা লাঞ্চও দুপুরে ক্ষণিকের বিশ্রাম সেরে দর্শনীয় স্থান কংলাক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে গাড়ীতে চল্লাম।

গাড়ী যখন কংলাক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট দুরত্বে আমাদের নামিয়ে দিলো, তখন আঠারো শত ফুট উচ্চতার পাহাড়টিকে দেখে শরীরের মধ্যে একটা ঝাঁকুনি দিলো। মনে হলো পাহাড়টি মেঘ ফুড়ে আরো উচুতে উঠে গেছে। অন্যান্য পর্যটকেরা বলাবলি করছিলো, পাহাড়ের উপরে অক্সিজেনের স্বল্পতা রয়েছে। তাই বয়স্ক ব্যক্তি ও হার্ট দূর্বল ব্যক্তির পাহাড় ট্রাকিং না করাই উচিত।

আমার কর্তার ইতিপূর্বেই হার্ট এটাক হয়ে আইইউসিতে ছিলেন, এবং তার হার্টে রিংপরা রয়েছে। তার জন্য পাহাড়ে ওঠা মানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। সুতরাং সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো যে পাহাড়ের চূড়ায় উঠবেনা। পাঁচ টাকা দিয়ে নলি বাঁশের লগি কিনে তিন পা বানিয়ে আস্তে আস্তে পাহাড়ের গা বেয়ে আমরা উঠতে লাগলাম। পাহাড়ের চূঁড়া হতে যারা নেমে আসছে তাদের সাইড দিতে গেলে ঝামেলা হচ্ছে। সামান্য এদিক ওদিক হলেই নিচে পড়ে ভবলীলা সাঙ্গ। ওকে নিচে রেখে পাহাড়ে উঠছি মনে কষ্ট অনুভব হচ্ছে। কী আর করা!মাঝামাঝি পৌঁছাতেই পিছন হতে কাঁধে পরিচিত হাতের ছোঁয়া পেতেই অবাক হয়ে গেলাম। তুমি! থ’ হয়ে রইলাম ওই অকুতোভয় লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে। চির জীবন একই রকম হয়ে রইলো। কোন বারণ সে তোয়াক্কা করেনা। ভয় পেলাম! এখন কি হবে? অবশ্য ভালই হয়েছে আমার সফর সঙ্গীরা দ্রুতই উপরে উঠে যাচ্ছে। একা উঠতে ভয় ভয় করছিল, ওর দেহকে আঁকড়ে ধরে আল্লাহর নাম নিয়ে উঠতে শুরু করলাম। অবশেষে এক সময় চূঁড়ায় পৌঁছে গেলাম। সফর সঙ্গীদের কোন চিহ্ন নেই। হাজার মানুষের ভীড়ে খুঁজতে খুঁজতে দেখি, তারা ফটো সেশনে ব্যস্ত। কর্তাকে দেখে তারাও বিস্ময়ে হতবাক। আমি বারবার ওর দিকে দেখছিলাম নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কিনা? প্রাণবন্ত টগবগে যুবকের মতন তার উচ্ছ্বাস দেখেও মনটা শংকিত হয়ে রইলো, যতক্ষণ নিচে নেমে না এলাম। পাহাড়ের চূঁড়ায় ফটো সেশন করে দোকানে বসে পাহাড়িদের বিশেষভাবে বানানো ‘ব্যাম্বো টি’ খেলাম। সেটাও একটা মজার অভিজ্ঞতা। এবার নামার পালা!

অনেকেরই জানা আছে কত সহজে বিড়াল মান্দার গাছে উঠে যায়, কিন্তু নামার সময় তার কিযে! কষ্ট হয়? আমারও নামতে যেয়ে সেরকম অবস্থা হলো। ও যদি উপরে উঠে না আসতো, আমি হয়তো পড়ে অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতাম। নামাটা খুবই বিপজ্জনক ও বেশ মজার। হাতের লগিটা মাটির সামনে ঠেকিয়ে শরীরের ভারসাম্য লগির উপর বজায় রেখে সামনে দু’পা ফেলে এগিয়ে যেতে হয়! ও আমাকে শিখিয়ে দিলো। বেশ তরতর করে নেমে এলাম। বুঝতে পারলাম চারপাচ বছর রাঙামাটি খাগড়াছড়ি চাকরি করে সাহেবের ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে। ওখান থেকে বিজিবির হেলিপ্যাডে সবাই ঘুরতে এলাম। টিলার পরে বিশাল এলাকা নিয়ে হেলিপ্যাড! সন্ধার গোধূলিতে শিশু থেকে সকল বয়সী মানুষের কোলাহলে এলাকাটি মুখরিত। পাহাড়ের টিলায় দাঁড়িয়ে গাড় লাল সূর্য মামা তার সব রঙ হারিয়ে আস্তে আস্তে মেঘের কোলে ডুবে গেল। অপূর্ব অস্ত যাবার দৃশ্যটি আজীবন মানসপটে স্থির চিত্র হয়ে রইবে।

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১। সবাই সকালে ফুরফুরে মন নিয়ে শয্যা ত্যাগ করলাম। এবার রাঙামাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। বেলা একটার মধ্যে খাগড়াছড়ি ফিরে এলাম। তিনটায় খাগড়াছড়ি হতে বাসে রাঙামাটি পৌঁছে গেলাম। চার পাঁচ বছর এখানে থেকেছি। রাস্তাঘাট সব নখ দর্পণে। মনে হলো নিজের শহরে অনেক দিন পর এলাম। রাজ বন বিহার, আসাম বস্তি, ঝুলন্ত ব্রীজ, ডিসি পার্ক, রাজবাড়ী, সেনাবাহিনীদের তৈরি আরণ্যক পার্ক, প্যাদা টিংটিং, শুভলং, মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধি স্থল, কাপ্তাই লেক-অন্যতম দর্শনীয় স্থান। দুইদিন রাঙামাটি দর্শনীয় স্থান সমূহ দেখার পরে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাতটায় বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। পার্বত্য তিন জেলার রাস্তা ঘাট একই রকম নৈসর্গিক শোভা বিদ্যমান। দুইপাশে পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে আকাঁবাঁকা মসৃণ। কিন্ত ভয়ংকর বিপদ সঙ্কুল রাস্তা। একবার সাঁ করে গাড়ি ঢালু পথ বেয়ে নিচে নেমে যায়, আবার গোঁ গোঁ গর্জন করতে করতে উপরে উঠতে থাকে। কোন রকম যান্ত্রিক ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে আর রক্ষা নেই। আমাদের সমতল ল্যান্ডের গাড়ি চালকেরা পাহাড়ি পথে গাড়ি চালাতে সাহস করবে না।

প্রকৃতির অনন্য উপহার বান্দরবানে অনেক কিছু দেখার আছে। হোটেলের ম্যানেজার আমাদের হাতে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের লিস্ট ধরিয়ে দিলেন। সমস্ত দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতে হলে দিন পনেরো লেগে যাবে। নীলাচল, মেঘলা পার্ক, দেবতা কুম, বগালেক, স্বর্ণমন্দির অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ত্রিশ তারিখ সন্ধা পর্যন্ত বান্দরবানে অবস্থান করে রাতের গাড়িতে মাগুরার উদ্দেশ্য রওনা হলাম। তিন পার্বত্য জেলাতে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের চোঙের ভিতর রান্না করা, ভাত গোস্ত, বন মোরগ, মাছ, চিকেন বিরিয়ানী শুধু নয় যে কোন ধরনের বিরিয়ানী খেয়ে না আসলে আপনার ভ্রমণে অতৃপ্তি থেকে যাবে। পাহাড়ে বড়োতে গেলে এসব কোনো কিছুই মিস করবেন না।
সুলতানা কাকলি: লেখিকা, সাবেক গার্লসগাইড

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology