আজ, রবিবার | ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১১:১৭

ব্রেকিং নিউজ :

আমেরিকায় ভালো থাকা আর সংগ্রামের গল্প

শেখ কবিরুল হাসান : কর্মই শ্রেষ্ঠ। সততার সাথে সে যে কর্মই হউক।

আমেরিকাতে আসার পর প্রথম তিন মাস সুপ ও পিৎজা ডেলিভারি কাজে যোগ দিলাম। খুউব কষ্ট লাগতো , মাঝে মাঝে কাঁন্না পেত তবে সে কাঁন্না দেখার কেউ থাকতো না।এক সময় চোখ মুছে বাসায় হাস্যোজ্জ্বল হয়ে থাকতাম।
কীসের বেদনা ? আমরা সুখি ।

সবাই এত ব্যাস্ত যে, কে কাঁদলো কে হাসলো তা দেখার সময় নেই। এ দেশে বছরকে সেকেন্ড দিয়ে ভাগ করা। প্রতিটা সেকেন্ড মিস করলে নিজেকে পিছিয়ে ফেলবে নিজেই, নিজের অজান্তে। এইজন্য এখানে রাত ও দিন সমান এবং সকল কর্মের মূল্য অনেক বেশি।

স্যুপ ও পিৎজা ডেলিভারি ছেড়ে কী করবো ভাবছি। কারণ সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত পাঁয়ে হেটে স্যুপ ডেলিভারি করে আর শরীর চলতো না। এরপর বিকাল ৪ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত চলতো সাইকেলে পিৎজা ডেলিভারি। যখন বাসায় ফিরতাম নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলতাম। কী কষ্ট , কত কষ্ট, কেমন কষ্ট বুঝাতে পারবো না। তবে ব্যাথা টা আজও উপলব্ধি করতে পারি। পা ফুঁলে যেত, সারা শরীরে ব্যথা থাকতো। তবে তাতে কী আমাকে কর্ম করতেই হবে।

সবার মুখে হাঁসি ফুটাতে নিজের কষ্টকে নিজের হৃদয়ের মাঝে কবর দিতে হতো। সেই সঙ্গে মনে মনে পথ খুঁজতাম ভাল কিছু করার তবে সব সহজ নয়। কিছু পেতে গেলে অনেক পথ হাঁটতে হবে, আমি ভাবতাম আমার সে পথ চলা কবে শেষ হবে ?

বহু চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে সব ছেড়ে দিয়ে ড্রাইভিং পেশায় নাম লিখালাম।
মনে মনে ভাবতাম এ আর কী এমন কাজ ? ডান পায়ের আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিবো আর হন হন করে চলবে। আর কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার পকেটে জমা হবে। মনের মধ্য স্বপ্ন রাঙাতে লাগলাম আর কত কী ভাবতাম। না , এতো সহজ নয়।

প্রথম যে দিন হলুদ গাড়ি নিয়ে বাহির হলাম সে দিনই বুঝেছিলাম এটা আরও কঠিন পেশা। কারণ নিজের ব্যবহার, পুলিশ, যাত্রীর আচরণসহ নিজ গাড়ীর ৩ গ্লাস সঙ্গে রাস্তার প্রিন্ট সাইন, ঝুলন্ত সাইন, গোপন ক্যামেরা আরও কত কী!

সবাই বলে ড্রাইভিং পেশা স্বাধীন , আসলেই কি স্বাধীন ? ১০০% সত্য না। যাই হোক ১২ ঘন্টা ড্রাইভ করে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, বছরের পর বছর চলতে থাকলাম হাজার মাইলের পর হাজার মাইল।

মাঝে মাঝে এতই ক্লান্তি আসতো যে আর পারতাম না। কিন্তু তবুও পারতে হবে নিজ পরিবার সহ কত কিছুর জন্য।

ফাঁকে ফাঁকে গরম কফি আর সিগারেটে দম দিতাম আর ভাবতাম, আল্লাহ্ যদি এমন সুযোগ করে দিতেন যে, বসে থাকবো আর ডলার আসবে হাতে।

আল্লাহ্  সে সুযোগও করে দিলেন গত ১২ই মার্চ ২০২০ দুপুর বেলা থেকে। ঠিক এই তারিখের ৩ মাস পর নিজ ব্যাংকে ডলার আসা শুরু হলো, চলতে থাকলো আজও পর্যন্ত । প্রায় ১ বছর ৪ মাস বসে বসে খেলাম। বসে খাওয়ার আরেক পরিণাম পারিবারিক “অশান্তি”।

এই অবসরকালিন কত কী করলাম ফ্রী শ্রমে বাজার করে মানুষের বাসায় পৌঁছে দেওয়া , বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ফাঁকে ফাঁকে মাছ মারতে মারতে জেলে সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেল্লাম। সেখানেও কোলাহল দ্বন্দ্ব, কয়েকটা প্রিয়জনকে হারালাম মাছ মারার দ্বন্দ্বে।

তবে যে টুকু অবসর পেতাম সে টুকু সময়ে হতাশায় বিভোর হতাম এই ভেবে যে, এই ( সামান্য ডলার বলবোনা ) ডলার আসা যে দিন থেকে বন্ধ হবে তখন কী করবো ? বিশাল প্রশ্ন ? এ প্রশ্নের সীমানা কতখানি বলতে পারবো না। তবে আমি অনুভব করতে পারতাম বা পারি।

ভাবতে ভাবতে নিজেকে প্রায় শেষ করে দিতে লাগলাম। তবে পরিবারের কাছে ধরা দিতাম না। কারণ আমার উপর কত দায়িত্ব নিজ পরিবার, বাবা-মা, শ্বাশুড়ি, ভাইগুলো সহ আরও কত কী ?

তারা জানে ছেলে আমেরিকা থাকে, দিতে পারবিনা মানে, পারতেই হবে।
এই যে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে টাকা পাঠানো এটাও একটা বেদনা। আমার চলুক বা না চলুক তাতে কী , তোকে নির্দিষ্ট তারিখে দিতেই হবে। এই যে বাধ্যকতা সব সময়ই বেদনাদায়ক।
আর এই বাধ্যকতা নিজেকে শেষ করে দেয়। হার্ট এ্যাটাকসহ কত কী হয়।
যাক বসে বসে খাওয়ার শখ মিটতে থাকলো সেই সঙ্গে চিন্তা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো।

মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যেতাম কী করবো, কোথায় যাব, কীভাবে আবার অর্থ ইনকাম করতে পারবো। কারণ ঘাড়ের উপর বিশাল চাপ । এ চাপের ওজন নেই তবে অনুভূতি আছে, উপলব্ধী আছে। তবে প্রকাশের ভাষা নেই।

সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে আবারও শুরু করলাম কর্ম । তবে এবার হলুদে না , UBER এ । যে হতাশায় নিজেকে হারাতে বসে ছিলাম তার থেকে অনেক ভাল আছি ১০০%।

তবে কীভাবে সেকেন্ড, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস চলে যায় বলতে পারি না। নিজ গৃহে আশ্রয় মিলে ৮ ঘন্টা তার মধ্য নিজেকে ফিট রাখতে প্রতিদিন হাঁটতে হয় ১ ঘন্টা, গাড়ী পরিস্কার করতে হয় ২ ঘন্টা, এরপর গোসল, নামাজ ও খাওয়া। বেলা ২ টা বাজলেই নিজেকে আর বিছানায় রাখতে পারি না।

তবুও সব শেষে বলবো কর্মই শ্রেষ্ট, কর্মই মানুষকে বাচিয়ে রাখে।
কর্মই মানুষকে সঠিক বা সফল মানুষ হিসাবে গড়ে তোলে।
কর্মের বিকল্প নাই ।

জীবনের এক চাওয়া ছিলো বসে বসে খাবো। দেখলাম বসে খাওয়ার মধ্য আনন্দ নেই, নেই স্বাধীনতা, সব সময় একটা হীনমন্নতা কাজ করতো। লজ্জা লাগতো আরও কত কী।

আজ নিজ পেশায় ফিরে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে। কর্মহীন ও কর্ম করে বাঁচার মধ্যে পার্থক্যটা বুঝেছি বাস্তবতার মাঝে।

আবারও বলবো “কর্মই শ্রেষ্ট ”।
লেখক : শেখ কবিরুল হাসান, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, ফ্রিল্যান্সার ফটোগ্রাফার। 

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology