আজ, বুধবার | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | রাত ৮:০৮

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরায় জাতীয়তাবাদী যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন মাগুরায় প্রত্যাহারের শেষ দিনে ৩ চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত মাগুরায় কাত্যয়নী উৎসব আয়োজনের সিদ্ধান্তে জাসদের অভিনন্দন মাগুরায় রাজাকার পুত্রকে নৌকা দেয়ায় বিক্ষোভ তাণ্ডবের বিরুদ্ধে মাগুরায় ঐক্য পরিষদের অনশন ও বিক্ষোভ মাগুরার ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী পূজা বন্ধ রাখায় জাসদের নিন্দা জ্ঞাপন মাগুরায় নির্বাচন নিয়ে ৪ জন নিহতের ঘটনা ‘অনাকাঙ্খিত-ন্যাক্কারজনক’-সিইসি কেএম নুরুল হুদা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মাগুরায় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ মাগুরায় আওয়ামী লীগের “সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভা যাত্রা” শেখ রাসেলের জন্মদিনে ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে ডাঃ রাব্বির খাবার বিতরণ

মাগুরার বিয়ে বাড়ির গল্প

সুলতানা কাকলি : প্রতিটি মানুষকেই তার সমগ্র জীবন পরিক্রমায় ধাপে ধাপে বেশ কিছু সিঁড়ি পার হতে হয়। সেই জীবন পরিক্রমায় বিয়ে চিরন্তন এক অনুষঙ্গ।বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় সবাইকে। প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জীবনে এ এক মধুরক্ষণ।”বিয়ে” কথাটা সামনে এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিয়ে বাড়ির একটা আনন্দ মুখর, আলো ঝলমল নজর কাড়া মুগ্ধ পরিবেশ আর সেই সাথে সামাজিক ভাবে পালনীয় কিছু আচার অনুষ্ঠান যা বর পক্ষ ও কনে পক্ষের সম্মতিতে পালিত হয়ে থাকে।

আমাদের মাগুরার সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ভেদে বিয়ে বাড়ির চেহারা একটু রকমফের হলেও সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতি এক ও অভিন্ন। বয়সের কারণেই হোক, কিংবা অর্থনৈতিক কারণে হোক সন্তান যখন বিয়ের উপযুক্ততা অর্জন করে, তখন থেকেই সন্তানের বিয়ের চিন্তায় বাবা- মায়ের ভ্রু কুঁচকে আসে। কন্যা সন্তান হলেতো চিন্তার দায়টা আরোও একটু বেশিই থাকে। আর ছেলে সন্তানের বিয়ের দায়বদ্ধতা বাবা-মায়ের মাঝে একটু কমই দেখা যায়। সেখানে বেশ নিশ্চিন্ত ভাব পরিলক্ষিত হয়। মেয়েরা যখন আঠারো বছরে পা রাখে তখনই তাকে সৎ-সুন্দর পাত্রে পাত্রস্থ করার দায়িত্ব এসে ভর করে বাবা- মায়ের কাঁধে। কনে দেখা দেখা থেকে পাত্রী সমর্পণ-বিয়েতেদু পক্ষেরই অনেকগুলো ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।

কনে দেখা বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। একসময় কনে দেখা নিয়ে কতো না ঘটনা ঘটতো। সময় পাল্টে গেছে। এখন আগের সেই নিয়ম-কানুন নেই। তবুও প্রথা বিলুপ্ত হয়নি। এখনও গ্রামেগঞ্জে কনে দেখার দিনে ছেলে পক্ষের বাড়িতে রীতিমত হৈচৈ পড়ে যায়। পাড়া প্রতিবেশীদের কর্ণ কুহরে সংবাদ পৌঁছে যায় যে, ছেলে পক্ষ মেয়ে দেখতে যাবে। কথা গোপন থাকে না, ছেলেদের বাড়িতে পক্ষকাল ধরেই চলে নানান রকম পরিকল্পনা। কে-কে যাবে, কিসে যাবে, কি মিষ্টি নিতে হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চলে জল্পনাকল্পনা। অতঃপর যথা সময়ে ভালো পোশাক -আশাকে সজ্জিত হয়ে সবাই দলবেঁধে একটা কোলাহল মুখর পরিবেশ ও আনন্দিত মন নিয়ে কনের বাড়ির দিকে ধাবিত হয়। ওদিকে কনের বাড়িতে উল্টো চিত্র দেখা যায়। চুপ- চাপ নিরিবিলি পরিবেশ। মনে খুশির ঝিলিক থাকলেও মুখের ওপর হালকা কালো মেঘের ছায়া, দুশ্চিন্তা লুকোচুরি খেলতে থাকে। অমঙ্গল ভাবনা এসে ভর করে, শেষমেশ ওরা আমাদের মেয়েকে পছন্দ করবেতো? তাই মেয়ে পক্ষ কনে দেখার ব্যাপারটি গোপনে সারতে চায়,কেননা যদি কেউ বিয়ের ব্যাপারে ভাঙচি দেয়।আরও মজার ব্যাপার হলো কনের বাড়িতে পিঠেপিঠি কোনো বোন বা অন্য কোনো মেয়ে থাকলে তাকে কনে দেখার দিনে লুকিয়ে রাখা হয় যাতে করে পাত্রস্থ কনেকে রেখে যদি পাত্রপক্ষ ওই মেয়েদের কাউকে পছন্দ করে বসে? কনে পক্ষের আপ্যায়নে, আদব- কায়দা ও লেহাজে যদি পাত্রপক্ষ খুশি হয়ে যায়, তবে তো আলহামদুলিল্লাহ।

বিয়ের দিন ক্ষণ ঠিক হয়ে গেলে শুরু হয়ে যায় আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী বিয়ের প্রস্তুতি। বিয়ের বাজার থেকে শুরু করে খাবারের মেন্যু পর্যন্ত ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সব ব্যবস্থা যখন সম্পন্ন হয় তখন শুরু হয় কার্ড ছাপিয়ে দাওয়াতের পর্ব। বিয়ের দিন ক্ষণ যতো এগিয়ে আসে তখন শুরু হয় ঘরবাড়ি পরিস্কার করা থেকে শুরু করে নতুন আসবাব বানিয়ে ঘর সাজানোর ব্যস্ততা।বিয়ের আনন্দে উঠোন খানাও যেনো নতুন যৌবনে সজ্জিত হয়।বিয়ের সপ্তাহ খানেক আগে থেকে শুরু হয় আত্নীয় স্বজনের সমাগম। দাদী, নানী, খালা, ফুপু, ভাস্তি ভাগ্নীর বিয়ের আনন্দে শামিল হয়ে তৈরি করে আনে নানা রকম পিঠা। আরও থাকে বিভিন্ন প্রকার মিষ্টির বাহার। আরও থাকে পান সুপারি চুন খয়েরের সমারোহ, যাতিতে সুপারি কাটার খটখটানি শব্দে  বাড়ি হয়ে ওঠে আনন্দ উল্লাসে টুইটুম্বুর। মা-খালা,ফুপু ও যতো মুরব্বি মহিলারা আছেন তাদের ঠোঁট যেন পানের রঙে রাঙিয়ে থাকে টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো। পান না থাকলে বিয়েবাড়ি যেন পূর্ণতা পায়না।আত্নীয় স্বজনের সমাগমে বিয়ে বাড়ী হয়ে ওঠে মুখরিত। খাওয়ার- শোয়ার ঠিক থাকেনা,হৈচৈ করে সবাই আনন্দ উল্লাসে মুখরিত হয়। বিয়ের সাতদিন আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ আত্নীয়রা কনেকে আদর করে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গায়ে হলুদ ও ক্ষীর ভুজনি অনুষ্ঠান করে থাকে। কনের জন্য নতুন কাপড় কিনে চাচী, ফুপু, মামী, খালারা শুরু করে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান।

অবস্থান ভেদে এই আচার অনুষ্ঠান চলতে থাকে বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত। কনের বাড়িতে এ সময় চলে বিভিন্ন রকমের বিয়ের গান যাকে আমরা গীত গাওয়া বলি। এছাড়াও বিয়ে বাড়িতে মাইক অথবা ডেক বাজিয়ে আনন্দ উপভোগ করার প্রচলন রয়েছে। দুপক্ষের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান আরও চমকপ্রদ ও আনন্দ উল্লাসে ভরপুর। ছেলে- মেয়েরা লালপেড়ে হলুদ শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে বর্ণিল ডালা সাজিয়ে গায়ে হলুদের তত্ত্ব নিয়ে ছোটে এ বাড়ি ও বাড়ি। ওই দিন চলে রঙ মাখার খেলা। রঙ মেখে সঙ সেজে সে এক নাকাল অবস্থা। এটা না হলে যেন বিয়ের মজা পূর্ণ হয়না। বিয়ের আগের দিন কনের মা নিজের উঠানে আত্নীয় দের দাওয়াত করে নিজের কন্যার মুখে হলুদ মাখিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে আদর সোহাগ করে কন্যাী নিজের সংসারে পাঠানোর জন্য তৈরি করে।মায়ের চোখ অশ্রুসিক্ত হয় মনের অজান্তে। তারপরও কন্যাড সুখের সংসার সাজানোর আনন্দে বুক বাঁধে। বিয়ের আগের সারারাত জেগে চলে গান বাজনা ও গেট সাজানোর ব্যস্ততা। বাড়ির অতি উৎসাহী ছেলে- মেয়েরা বাড়ি ঢোকার প্রবেশ পথে কলা গাছের গেট তৈরী করে। নানান রঙের কাগজ ও জরির সংমিশ্রনে মনোরম গেট তৈরি করে। কাঙ্খিত সেই বিয়ের দিনে কন্যা পক্ষরা লাল ফিতা ও কাঁইচি নিয়ে গেট আটকিয়ে বরযাত্রী দের নিকট হতে টাকা আদায় করার জন্য নানান বাহানা করে। গেটে দু’পক্ষই ইংরেজিতে করে তর্কবির্তক। তাদের তর্কের বহর দেখে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যায়। অবশেষে বরপক্ষ কনে পক্ষের হাতে নগদ টাকা গুঁজে দিয়ে গেট দিয়ে ঢোকার অনুমতি পায়। এবার জামাইকে শরবত খাইয়ে, মিষ্টিমুখ করিয়ে,দুধপাখা দিয়ে বাতাস করে কোলে অথবা হাতধরে বর আসেন বসানো হয়। শুরু হয়ে যায় জামাই সহ বরযাত্রীদের শরবত, মিষ্টি বিভিন্ন রকমের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন। এরপর কাজী দিয়ে বিয়ে পড়ানোর সময়ে বরের জুতা চুরি নিয়ে হয় মজার কান্ড। নতুন শালি বাহিনীকে টাকা দিয়ে বরকে জুতা পুনরুদ্ধার করতে হয়।বিয়ে সমাপন শেষে শুরু হয় ভুরি ভোজন পর্ব।আমাদের মাগুরার বিয়ে বাড়ির বিশেষ ঐতিহ্য হচ্ছে বরের সাগোরানা সাজানোর পর্ব।সামর্থ্য অনুযায়ী বড় খাঁঞ্চা ভরে বিভিন্নধরনের খাবার সাজাতে হয়,যেখানে থাকে আস্ত খাসির পেটের ভিতর আস্ত মুরগি ও ওই মুরগির পেট ভর্তি করে ডিম দেয়া হয়।সাথে আরও থাকে বড় রুই,কাতলা,ভেটকি মাছের রোষ্ট,মুরগির রোষ্ট, মিষ্টি ও হরেক রকমের পিঠা। মজার ব্যাপার হলো বরের সাথে বরের বন্ধু মহল ওই খাঁঞ্চা ভরা খাবার একত্রে খেতে বসে। তারপর হয় বরের হাত ধোয়ানি। শালিরা বরকে সযত্নে হাত ধোয়ানোর পর টাকা দাবী করলে সেখানেও শুরু হয় বাক বিতন্ডা। শেষমেষ বরপক্ষ হার মেনে শালি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আনন্দ মশকারা করে খাওয়ার পর্ব শেষ হয়।

এরপর আসে “আয়না দর্পণ” পর্ব। এখানে প্রধান ভুমিকা থাকে কনের বান্ধবী এবং ভাবিদের। বর- কনের মাথার উপর ওড়না দিয়ে ঢেকে দুজনের সামনে আয়না ধরে। বরকে জিজ্ঞেস করা হয়, আয়নার মাঝে কি দেখলে? চাঁদ না সূর্য? বর বলে চাঁদ দেখলাম। এভাবেই আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে শুভ বিবাহের সমস্ত পর্ব সমাপ্ত হয়। এরপর আসে বিদায়ের পালা। কোনো কোনো বাড়িতে কোনে বিদায় হয় পরের দিন। সারা রাত জেগে চলে নাচ-গান করা ও বাজি পোড়ানো। পরদিন সকালে বিদায় বেলায় কনে মা,বাবা,আত্মীয় দের জড়িয়ে ধরে মুখ লুকিয়ে কাদঁতে থাকে। শশুর বাড়িতে যাবার সময়ও ছিড়তে চায়না ছোটোবেলার এই নাড়ির বাঁধন। মা-বাবা কন্যাকে জামাই এর হাতে তুলে দিয়ে চোখের জলে বিদায় জানাই। ইদানিং শহরাঞ্চলের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়ানোর জন্য নিজ বাড়ির পরিবর্তে কম্যুনিটি সেন্টারে বিয়ের জমজমাট ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেখানেও বিয়ে বাড়ীর আমেজে বিয়ের সকল আচার অনুষ্ঠান পালন করে কনেকে চোখের জলে বিদায় জানানো হয়ে থাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে অনেককিছু। এখন বিয়ে বাড়িতে কলাগাছ আর দেবদারুর পাতা দিয়ে গেট সাজানো, লাল-নীল কাগজের ফুল টানানো, মাইকে লতা, রুনার গান বাজানো-এসব উঠে গেছে। পালকিতো এখন দেখা-ই যায় না। নৌকায় করে মাইক বাজিয়ে বর আসার সেই মোহনীয় চিত্র আর নেই। আর বিয়ে বাড়ির ধামা ভরা সেই পায়েশের গন্ধও কোথাও যেনো হারিয়ে গেছে।
সুলতানা কাকলি: লেখিকা, সাবে গার্লসগাইড

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology