আজ, বুধবার | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | বিকাল ৫:৫২

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরায় জাতীয়তাবাদী যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন মাগুরায় প্রত্যাহারের শেষ দিনে ৩ চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত মাগুরায় কাত্যয়নী উৎসব আয়োজনের সিদ্ধান্তে জাসদের অভিনন্দন মাগুরায় রাজাকার পুত্রকে নৌকা দেয়ায় বিক্ষোভ তাণ্ডবের বিরুদ্ধে মাগুরায় ঐক্য পরিষদের অনশন ও বিক্ষোভ মাগুরার ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী পূজা বন্ধ রাখায় জাসদের নিন্দা জ্ঞাপন মাগুরায় নির্বাচন নিয়ে ৪ জন নিহতের ঘটনা ‘অনাকাঙ্খিত-ন্যাক্কারজনক’-সিইসি কেএম নুরুল হুদা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মাগুরায় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ মাগুরায় আওয়ামী লীগের “সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভা যাত্রা” শেখ রাসেলের জন্মদিনে ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে ডাঃ রাব্বির খাবার বিতরণ

প্রিয় মামা বেবী সিদ্দিকি

লায়লা আরিয়ানী হোসেন : আমি তাঁকে মনে মনে খুঁজে ফিরি।
মাঝে মাঝেই পেয়ে যাই, ভাবনায়, আবার হারিয়ে ফেলি বাস্তবে।
নানাদিক থেকে যখন সমস্যা চেপে ধরে, চিন্তা করে কুল কিনারা পাই না, তাঁকে খুঁজি।
তাঁর যাবার বড্ড তাড়া ছিল।
পরম করুণাময় নাকি ভালোমানুষ তাঁর কাছে দ্রুত নিয়ে যান, হয়তো তাই আমরা আরও বেশিদিন তাঁর সঙ্গ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলাম।
তাঁর ছায়া সরে গেল মাথার উপর থেকে, কিন্ত মায়া জড়িয়ে আছে অন্তরে, মননে। কিছু মানুষ আমাদের পাশে না থাকলেও সাথে থাকে। তাঁদের কথা, শিক্ষা, আদর্শ, জীবনবোধ, এমনভাবে প্রভাবিত করে, তাঁদের অনুপস্থিতিতে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যায়।

আমার প্রিয় বেবী মামার কথা বলছি। বেবী সিদ্দিকী নামে যিনি সবার কাছেই পরিচিত। তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি যেমন প্রতিদিন কাঁদায়, ভাবায়, তাঁর আদর্শিক উপস্থিতি প্রতিমুহূর্তে জীবনের বাঁকে বাঁকে অনেক শিক্ষা দিয়ে যায়। তিনি ছোট বেলা থেকেই ছিলেন পরোপকারী, উদার, মানবিক মানুষ। শুনেছি নানীর মুখে, রাস্তায় কোন অনাহারী মানুষ দেখলে, পরম যত্নে দাওয়াত করে বাসায় নিয়ে আসতেন।

বলতেন, ‘’তুমি খাওনি? চলো আমাদের বাড়িতে, আমার মা বিরাট হাঁড়িতে করে, এত্ত ভাত রান্না করে, তুমি চল, তুমি খাবে।” বড় হয়েও মানুষের জন্য সহানুভূতি ছিল মারাত্বক। সেই এক মণ মিষ্টি আর আধা পাউন্ড পাউরুটি চাওয়া পাগলাটে মানুষের আবদার যেমন মেটাতেন, নিজের শরীরে থাকা কাশ্মীরি শাল খুলে শীতার্ত মানুষকে দিয়ে দিতে কখনও দুইবার ভাবেননি। যার প্রয়োজন মেটাতে কর্মসংস্থান করতে হতো, তাও করে দিতেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা বা সামাজিক সম্পর্ক, সবকিছুতে তাঁর সহজ মনোভাব। মানুষের সাথে সম্পর্কের মাপকাঠি তাঁর একটাই, মানবিক আচরণ। চেনা অচেনা স্বল্প চেনা, যে কেউ তাঁর কাছে এসে দাঁড়াত, কাউকে তিনি ফেরাতেন না। কারো উপকার হবে, সেই কাজ তিনি যেভাবেই হোক করতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, করেছেন সক্রিয় রাজনীতি, সমাজ সচেতন সুশিক্ষিত মানুষ। তাঁর চেনা জানা মানুষের তালিকায় যত প্রথিতযশা মানুষ ছিলেন, নিজের জন্য কখনো কিছু চান নাই, কিন্তু আশেপাশের যার যেমন প্রয়োজন, নিজে যেচে কাজ করে দিতেন। বিনিময়ে কিছুই চেয়ে নেননি, বরং মানুষ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে কতো কি কথা দিয়ে বেমালুম ভুলে যেত, সেটা নিয়ে তাঁর কোন আফসোস ছিল না।

তাঁকে যে একবার দেখেছে, মনে রেখেছে। প্রাণখোলা হাসি, প্রাঞ্জল কথকতা আর সাহিত্য সঙ্গীতের প্রগাঢ় জ্ঞানে ভরপুর। আবার ব্যক্তিত্বে স্বতন্ত্র সমন্বয়। সমৃদ্ধ বর্ণিল জীবন তাঁর। তাঁর সাফল্য, তিনি আজও বহু মানুষের মনে বাস করেন প্রচন্ড ভালোবাসায়। তাঁর কথা আজও চোখের কোলে পানি থাকলেও মুখে হাসি নিয়েই স্মরণ করেন স্বজন পরিজন এমনকি স্বল্পসময় পরিচিত মুখ। এমন জীবন কয়জনের হয়? তাঁকে আমি বলি মুকুটহীন সম্রাট। ধর্ম-বর্ণ আর্থ সামাজিক অবস্থান বা অন্য কোন প্রচলিত ভেদাভেদের মাপকাঠি তাঁর ছিল না। সবার সাথে আন্তরিক ব্যবহার করতেন, আন্তরিক ব্যবহার পেলে খুব খুশি হতেন।

তিনি নিজেই বিশাল এক প্রতিষ্ঠান। শাসন, আদর, প্রশ্রয় সাহস, আবদার আহ্লাদ সব ছিল তাঁর ভাণ্ডারে। আমি তাঁর পরিচয়ে পরিচিত হতে সবসময় পছন্দ করি। কোন এক অনুষ্ঠানে, প্রধান অতিথি তৎকালীন সংসদ সদস্য জনাব আসাদুজ্জামান, তাঁর কাছ থেকে পুরষ্কার নিচ্ছিলাম। তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমি কে? আমি বড় করে একটা হাসি দিয়ে বলেছিলাম, আমার মামা বেবী সিদ্দিকি। উনি আমার সাথে হ্যান্ড শেক করতে করতে বললেন, ‘মুকুল দিদি তোমার মা …।’ আমি আরও বড় করে হেসে বলেছি, আমার মামা বেবী সিদ্দিকি। আমার জীবন বৃত্তান্তে তাঁর নাম ব্যবহার করার সুযোগ থাকলে, করতাম। তাঁর জন্য কিছু করা হয়নি। ডুবতে ডুবতে হাঁসফাঁস করে ভেসে ওঠা আমার জিবনে, কিছু করার উপযুক্ত হবার আগেই তিনি চলে গেলেন।

কোন এক ঈদে, তিনি কাপড় কিনতে গেছেন। দোকানী বলেছেন, “কার জন্য, আপনার মেয়েদের জন্য?’’  বলতে বলতে কিছু উজ্জ্বল রঙের কাপড় নিয়েছে হাতে, মামা বললেন, “ভাগ্নির জন্য”।
দোকানী সাথে সাথে বলেন, ‘ওহ, তার তো গায়ের রং আপনার মেয়েদের মতো অত ফর্সা না, এসব রং মানাবে না’।’
… এ কথায় খুব বিরক্ত হয়েছিলেন মামা। ওই দোকান থেকে কাপড় কেনেন নাই।

তাঁর কথা হল, ”আমার ভাগ্নি আমার, তার গায়ের রং নিয়ে কেন তুলনা? কি মানাবে কি নয়, তা নিয়ে মন্তব্য কিসের? কেন এত সাহস… কোন সাহসে আমার ভাগ্নির গায়ের রং নিয়ে কথা?

ছোট থেকে কারণে অকারণে আমাকে বলতেন, আমি নিজেকে যেন মানুষ ভেবে বড় হই, শুধুই মেয়ে মনে করে কোন পূর্ব সংস্কার নিজের মধ্যে না রাখি। কারণ আমাকে নাকি শুধু মেয়ে নয়, ছেলে মেয়ে দুটোই হতে হবে। কেন তখন বলতেন, জানি না। তবে, যখন নানান দায়িত্ব একা পালন করতে হতো, এই কথাটা খুব মনে পড়তো। তিনি কি কোনোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, আমাকে ছেলে মেয়ে দুজনের দায়িত্ব পালন করতে হবে?

প্রায় ভাবি এখনো, মনে মনে ডাকি, একটা ছায়া যেন দেখি ঝাপসা লাগে, চোখ বন্ধ করলে, যেন স্পর্শের উষ্ণতা পাই, শুনতে পাই, “way to go my dear, you must, don’t look back…’’ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় অবয়ব, মিলিয়ে যায় কণ্ঠ। আমার বলতে ইচ্ছা করে, “যাবেন না প্লিজ, একটু থাকেন…।”

নেই, চিরতরে চলে গেছেন পরম শান্তির আশ্রয়ে। শূন্যস্থান পূরণ হয়না, কিছু ঠিক হয় না, শুধু আমরা অভ্যস্ত হই ক্ষত চিহ্ন ঢেকে রাখার নিয়ত চর্চায়। তাঁর মতো মানুষের স্থান পূরণ করা দুরের কথা, আশেপাশে চিন্তা করার মতো কেউ নেই। আমি তাঁর ভাগ্নি, সন্তান নই। সন্তানের মতো , কিন্তু আমার তিনি কাছে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের মতো। তাঁর উচ্চতায় যাওয়া সম্ভব নয়, চেষ্টা করে যাই মানবিক মানুষ হওয়ার। তাঁর কথা ভাবি, যা কিছু বলেছেন, জীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। অনেক বিষয়ে সহজ ধারণা করে নিতে পারি তাঁর প্রভাবেই। নিজেকে প্রত্যাশাহীন করার চেষ্টাও করতে থাকি সবসময়।

সিদ্দীক আহমেদ সিদ্দিকী, বেবী নামেই যিনি পরিচিত। তিনি এদেশের সুর্য় সন্তানদের একজন, বীর মুক্তিযোদ্ধা। ৮ অক্টোবর তাঁর চলে যাওয়ার দিন। মনে হয় এইতো সেদিন, সাল গণনায় বেশ অনেকদিন, স্মৃতির মণিকোঠায় জ্বলজ্বলে একজন মানুষ। তাঁকে ঘটা করে স্মরণ করতে হয় না, পরিবার পরিজন পরিচিত সবার মনেই সব সময় আছেন দারুণ ভালোবাসায়।
লায়লা আরিয়ানী হোসেন: ঘোষক, বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2021
IT & Technical Support : BS Technology